মুক্তিযুদ্ধে অন্তর্ঘাত পর্ব : খন্দকার মোশতাক আহমদ

১.

জুলাইর মাঝামাঝি কোনো এক সন্ধ্যা। ১৯৭১। কলকাতার সিআইটি রোডের একটি বহুতল ভবনের সাততলা। এখানেই থাকেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। মন্ত্রীসভার বাকিরা দিল্লীতে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী তলবে গেছেন। মোশতাক যাননি। দাওয়াত পাননি নাকি রাজধানী রক্ষার ভার তার হাতে- স্পষ্ট নয়। কলকাতাজুড়ে নানা গুজব ভাসছে। এর ভয়ঙ্করতমটি হচ্ছে পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়ার সব বন্দোবস্ত পাকা। ভারতের সাধ্য নাই সেটা ঠেকানো। এখন একটাই উপায় আপোষে যাওয়া। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিনিময়ে স্বাধীনতার দাবি ছাড়তে হবে। যদিও এইনিয়ে ইতিমধ্যেই শিলিগুড়িতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে যা বলার বলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু অনিশ্চিত সেই সময়কালে গুজবটা আরো ছানাপোনা জন্ম দিচ্ছে। এই গুজবের জনক হিসেবে যাকে সন্দেহ করা হয়, তার সঙ্গেই দেখা করতে গেছেন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম এবং জেনারেল ওসমানীর পিআরও নজরুল ইসলাম।

তার ঘরে সোফায় বসতেই খন্দকার মোশতাক কিছু না বলে হু হু কান্না জুড়ে দিলেন। অতিথিরা বিব্রত। মোশতাক ডুকরে কেঁদেই চলেছেন। খানিকপর নুরুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন- মোশতাক ভাই কি হয়েছে? এতে কান্নার দমক আরো বাড়লো। প্রশ্নটা আবারও করা হলো। এবার কান্নার স্কেল চড়িয়ে মোশতাক বললেন- আমি বেচে থাকবো আর আমার নেতা শেখ মুজিব বেচে থাকবেন না-এটা আমি মেনে নিতে পারি না। এটা আমি ভাবতে পারি না নুরু। আমরা বেচে থাকবো দুনিয়ায় আর মুজিব আমাদের চোখের সামনে থেকে সরে যাবেন দুনিয়া ছেড়ে। না না। এরপর পুরো বাংলা সিনেমার স্টাইলে চিৎকার করে বললেন- না, না। এটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না আমরা।

এরপর যা বললেন, তার সার সংক্ষেপ হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সন সরাসরি বলে দিয়েছেন পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুজিবের প্রাণরক্ষা দুটো এক সঙ্গে সম্ভব নয়। যদি মুজিবের অনুসারীরা তাদের নেতার প্রাণরক্ষা করতে চান, তাহলে পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকেই আপোষরফার চেষ্টা করতে হবে। ইন্দিরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। এবং মোশতাকের অভিমত একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষমতা আছে বঙ্গবন্ধুকে সহিসালামতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার। সেক্ষেত্রে তাদের শর্তে রাজী হওয়াই উচিত। কারণ বঙ্গবন্ধুই যদি না থাকে, তাহলে কিসের স্বাধীনতা!

মোশতাক যা বলেছেন, অর্থাৎ ইন্দিরা-নিক্সনের কথাবার্তা এবং ইন্দিরা-মুজিবনগরের নেতৃবৃন্দের আলাপ, তার সত্যতা কতটুকু এ নিয়ে পরে বিস্তারিত আলাপ হবে। তবে ঘটনাটার উল্লেখ এ জন্যই যে এর কিছুদিনের মধ্যেই দিল্লীতে তার পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী যুক্তরাষ্ট্রের দুতাবাসে যোগাযোগ করেন। সেখানে মূলত মোশতাকের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ইচ্ছা এবং তার ভিসার ব্যাপারেই আলোচনা হয়। এবং মাসের শেষ দিকে কুমিল্লারই আরেক সাংসদ জহিরুল কাইয়ুম কলকাতা দুতাবাসে যোগাযোগ করেন মোশতাকের প্রতিনিধি হিসেবে। এবং আলোচনায় ইঙ্গিত দেওয়া হয় মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে প্রয়োজনে স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষ করতে রাজী মুজিবনগর সরকার। সাদাচোখে দেখলে এখানে তীব্র মুজিবপ্রেম বেয়ে বেয়ে পড়ছে মনে হলেও বাস্তবে তা ছিলো না মোটেও। এর আড়ালে ঘনাচ্ছিলো ভয়াবহ এক চক্রান্ত এবং মোশতাক তার কর্মকাণ্ড ও তৎপরতাকে জাস্টিফায়েড করার জন্য এসব অজুহাত ব্যবহার করছিলেন মাত্র।

২.

আওয়ামী লীগের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই দলীয় কোন্দল ছিলো সীমাহীন। একমাত্র শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্বের কারণেই যা খুব নোংরামী রূপ ধারণ করতে পারেনি। যুদ্ধকালে তার অনুপস্থিতিতে সেটাই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিলো। একদিকে ছিলো চরমপন্থী তরুণ তুর্কীরা। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে এরা দাবী করছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব তাদের হাতেই দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দিন স্রেফ উড়ে এসে জুড়ে বসা লোক। ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন বেতার ভাষণ দিলেন এবং সেটা যখন বারবার আকাশবাণীতে প্রচার করা হচ্ছিলো, তখন ক্ষুব্ধ মনি দিল্লীতে বার্তা পাঠিয়ে তা বন্ধ করার অনুরোধ জানান।

মূলত, তাজউদ্দিনের মতো লিবারেল ঘরানার নেতৃত্বই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে সংগঠিত ও পরিচালনা করতে পেরেছেন। এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলীয় নীতিমালা প্রণয়নের ব্যাপারে তার উপর যথেষ্টই আস্থা রাখতেন মুজিব। মোশতাক ও তার মতো চরম ডানপন্থীরা স্বভাবতই মেনে নিতে পারেননি তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব। মুক্তিযুদধের গোটা সময়টাই তাই তার কেটেছে তাজউদ্দিনকে উৎখাত করতে। এজন্য শেখ মনিকে নানাভাবে উস্কানীও দিয়েছেন তিনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষ যখন ভেস্তে গেলো তখনও হাল ছাড়েননি মোশতাক। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নেতৃত্বে ৪০জন এমপির সাক্ষর করা আবেদন পত্র দাখিল করিয়েছেন তাজউদ্দিনকে অযোগ্য ঘোষণা করে।

মোশতাকের ইগোতে লাগার যথেষ্ট কারণ ছিলো বৈকি। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন তিনি। শেখ মুজিব অন্তরীণ থাকার সময় যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সঙ্গে মতভেদ ঘটেছে একবারই। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে ভাসানী-মুজিব যখন দলকে ধর্মনিরপেক্ষ করার দাবি তুলে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবি তুললেন, মোশতাক বিরোধিতা করেছেন। এজন্য এডভোকেট আলী আমজাদ খান, আবদুস সালাম ও হাশিমউদ্দিনকে নিয়ে পাল্টা সংগঠন গড়লেন। যদিও কিছুদিন পর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পাল্টে ফের চলে এলেন মূল দলে। পাঁড় কম্যুনিস্ট বিরোধী মোশতাক ১০ এপ্রিল কলকাতায় পৌছেই শুনলেন তাকে স্রেফ হাইকমান্ডের একজন হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বামঘেষা তাজউদ্দিন কিনা প্রধানমন্ত্রী! অথচ দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই দায়িত্ব তারই পাওনা। অভিমানে মোশতাক জানালেন উনি পদত্যাগ করলেন। তার ইচ্ছা মক্কা চলে যাবেন। এবং বাকি জীবনটা সেখানেই কাটাবেন। পাকিস্তানে আর ফিরবেন না।

৩.

ভরা মজলিশে মোশতাকের ডায়লগটি ছিলো বেশ নাটকীয় : আমাকে তুমরা সবাই মক্কায় পাঠায়া দাও। আমি সেখানেই মরতে চাই। আমি মারা গেলে আমার লাশ তোমরা বাংলাদেশে পাঠায়া দিও। দাউদকান্দির পীর হযরত খন্দকার কবিরউদ্দিন আহমেদের পূত্রের মুখে এই কথা শুনে সবাই বিভ্রান্ত হয়ে যান। আর তা কাটিয়ে দেন মুশতাকের অনুচররাই। তাদের মারফত জানা যায় নেতৃত্বের সিনিয়রিটি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী না হতে পেরে তিনি ক্ষুব্ধ। শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় হাতে পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে মক্কায় হিজরতের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন মোশতাক। পাশাপাশি পান আইন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বও।

চার বছর পর একই লোক তার অতিপ্রিয় কালো টুপি মাথায় কালো আচকান গায়ে চাপিয়ে শাহবাগের রেডিও বাংলাদেশ থেকে ঘোষনা দেন : প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সত্যিকার ও সঠিক আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপদানের পুত দায়িত্ব সামগ্রিক ও সমষ্ঠিগতভাবে সম্পাদনের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা ও বাংলাদেশের গণমানুষের দোয়ার উপর ভরসা করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। … খুনী সেনা কর্মকর্তা ফারুক-রশীদ-ডালিমদের সূর্য্যসন্তান আখ্যা দিয়ে মোশতাকের বক্তব্য শেষ হয়বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে। জয় বাংলার সঙ্গে যার নাম জপে এর আগের দিন পর্যন্ত মুখে ফেনা তুলেছেন, সেই বঙ্গবন্ধূর বুলেটবেঁধা লাশ তখনও পড়ে আছে ধানমন্ডী ৩২ নাম্বারের সিড়িতে।

দায়িত্ব পেয়েই বর্নচোরা তাবেদারদের নিয়ে গড়া মন্ত্রীসভায় আরো চমকপ্রদ এক আবদার আসে তার তরফে। মাথার টুপিটি খুলে টেবিলে রেখে বলেন : আমাদের জাতীয় পোষাক আছে তবে সেটা অসম্পূর্ণ। আমাদের মাথায় কোনো টুপি নাই। আপনারা যদি অনুমোদন দেন তাহলে এই টুপিটা আমাদের জাতীয় পোষাকের অন্তর্ভুক্ত করতে চাই…। প্রস্তাবটি পাশ হয়েছিলো। কার্যকর হয়নি সম্ভবত। তাহলে সবার মাথায় কালো টুপির মাধ্যমে মোশতাক অমর হয়ে থাকতেন। আর ৮১ দিনের দায়িত্বকাল পুরো হওয়ার শেষ দিকে তাজউদ্দিনের সঙ্গেও হিসেবটা চুকিয়ে নেন। রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে ৩রা নভেম্বর যখন জেলগেটে হম্বিতম্বি করছে, আতঙ্কিত জেলার ফোন করেন মুশতাককে- স্যার উনার তো কয়েদিদের খুন করতে চাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ আসে- ওরা যা করতে চায় করতে দিন। এক সারিতে দাড় করিয়ে চার জাতীয় নেতার মধ্যে তাজউদ্দিনই টানা ব্রাশফায়ারে মরেননি। রক্তের বন্যায় হেঁচকি তুলে একটু পানি চেয়েছিলেন। তার তেষ্টা মেটানো হয়েছিলো হৃদপিন্ডে বেয়নেটের গভীর মোচরে। সে হৃদয়ে বাংলাদেশ ছিলো।

৪.

সে যাত্রায় মোশতাককে বুঝিয়ে শান্ত করা হলো। ১৭ এপ্রিল এক গাড়িতেই নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মুজিব নগর গেলেন। হাসিমুখে ছবি তুললেন। ফিরলেনও। এরপর শুরু হলো তার সত্যিকার রাজনীতি- নোংরামী ও কূটচালে ভরপুর। আগরতলা, জলপাইগুড়ি, ত্রিপুরায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার জন্য পুরোশক্তি নিয়োগ করলেন তিনি। সেইসঙ্গে প্রচারণা চলতে থাকলো যে ভারত সরকারের কাছ থেকে সত্যিকার কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা বৃথা। আমেরিকাই এই বিশ্বে মা-বাপ, তাদের অনুগ্রহ নিয়ে একটা সমঝোতায় আসাই ভালো। রক্তপাত যা হওয়ার হয়েছে, এখন শেখকে প্রধানমন্ত্রী করে একটা কনফেডারেশন গঠন করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই ক্ষেত্রে মোশতাক একাই নন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীসভার বাকিসদস্যরাও (কামরুজ্জামান, মনসুর আলী) নিজেদের দাবি তুলে ধরতে লাগলেন। আর শেখ মনিতো ছিলেনই তার সবটুকু ঘৃণা নিয়ে।

ইতিমধ্যে তাজউদ্দিন তিনটি বড় কাজ করে ফেলেছেন- ভারতের মাটিতে প্রবাসী সরকারের রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র এবং একটি রেডিও স্টেশনের (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) মাধ্যমে সম্প্রচারের অনুমতি আদায়। কিন্তু পাশাপাশি খারাপ খবরও কম নেই। নিক্সন প্রশাসন ইন্দিরাকে চাপে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার ব্যাপারে। শেখ মুজিবের বিচারের তোড়জোড় চলছে। পাশপাশি পূর্ব পাকিস্তানে পছন্দের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেই জুলাইয়ের শুরুতে (৫ ও ৬ তারিখ) আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ডাকা হলো শিলিগুড়িতে।

এ বিষয়ে মঈদুল হাসান লিখেছেন : দেশের অভ্যন্তরে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার উদ্দেশ্যে গৃহীত ব্যবস্হাদির ফললাভের আগেই নানা কারণে সন্দিহান, বিভক্ত ও বিক্ষুব্ধ প্রতিনিধিদের সম্মুখীন হওয়া তাজউদ্দিন তথা মন্ত্রিসভার জন্য খুব সহজ ছিল না। তার প্রমাণও পাওয়া গেল শিলিগুড়িতে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দলীয় নেতৃবৃন্দ সমবেত হওয়ার পর। পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত প্রায় তিন শত প্রতিনিধির এই সমাবেশে (অবশিষ্ট ১৫০ জনের মত নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল পাকিস্তানিদের হেফাজতেই) অভিযোগ ও অপপ্রচারের স্রোতই ছিল অধিক প্রবল। প্রবাসী সরকারের সম্পদ ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাই এদের অনেক অভিযোগের উৎস। আবার সরকারী ব্যবস্হাপনার কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও নিঃসন্দেহে ছিল সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু এইসব অভাব-অভিযোগ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে অবলম্বন করে কয়েকটি গ্রুপ উপদলীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের দাবীতে ছিল নিরতিশয় ব্যস্ত।

আওয়ামী লীগের ভিতরে একটি গ্রুপের পক্ষ থেকে তাজউদ্দিনের যোগ্যতা এবং তার ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা নিয়ে নানা বিরুদ্ধ প্রচারণা চলতে থাকে। কর্নেল ওসমানীর বিরুদ্ধেও এই মর্মে প্রচারণা চলতে থাকে যে, মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্হাপনায় তাঁর অক্ষমতার জন্যই মুক্তিসংগ্রাম দিনের পর দিন স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের মৌলিক অনীহার কারণেই খুব নগণ্য পরিমাণ অস্ত্র তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, কূটনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন তারা নানা অজুহাতে এড়িয়ে চলেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত তাদের সমর্থন লাভ করবে কিনা, তাও সন্দেহজনক। এই সব প্রচার অভিযানে ভারতের উদ্দেশ্য ও তাজউদ্দিনের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির ব্যাপারে তৎপর ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ। মন্ত্রিসভার বাইরে মিজান চৌধুরীও প্রকাশ্য অধিবেশনে প্রদত্ত বক্তৃতায় একই সন্দেহ প্রকাশ করে দলীয় সম্পাদকের পদ থেকে তাজউদ্দিনের ইস্তফা দাবী করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের এক নৈরাশ্যজনক চিত্র উপস্হিত করে বলেন এর চাইতে বরং দেশে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ অথবা আপোস করা ভালো। কিন্তু এর কোন একটি চিন্তা বাস্তবে কার্যকর করার কোন উপায় তাঁর জানা আছে কিনা এমন কোন আভাস তাঁর বক্তৃতায় ছিল না।

কিন্তু সেখানে অসাধারণ এক বক্তৃতায় পাশার দান উল্টে দেন তাজউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু কিংবা স্বাধীনতা কোনটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এই বিভ্রান্তিকে এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে বলেন :“আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে পাব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যদি খোদা না করুন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে, তাইলে বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েও স্বাধীন বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে অমর ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি একটি নতুন জাতির জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হবেন। ব্যক্তি মুজিব, ব্যক্তি নজরুল, তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান কেউ হয়ত বেঁচে থাকবেন না। একদিন না একদিন আমাদের সকলকেই মরতে হবে। বঙ্গবন্ধুকেও মরতে হবে। আমরা চিরদিন কেও বেঁচে থাকব না।

আল্লাহর পিয়ারা দোস্ত, আমাদের নবী(সঃ) ও চিরদিন বেঁচে থাকেন নি। কিন্তু তিনি তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় আজ পরম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তেমনি, আমরা যদি বাঙ্গালী কে একটি জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, আমরা যদি বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক আরেকটি রাষ্ট্রের মানচিত্র স্থাপন করতে পারি, তাইলে সেই স্বাধীন জাতি এবং নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রভাত সূর্যের মত উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

আমরা যখন বাংলাদেশ ছেড়ে যার যার পথে ভারত চলে আসি, তখন কিন্তু জানতম না বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন, না শহীদ হয়েছেন। ভারতে এসে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমিও জানতাম না সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী কিংবা হেনা সাহেব(কামরুজ্জামান) জীবিত আছেন কিনা। আমি নিজেও বাঁচতে পারব এ কথাটি একবারও ভাবতে পারি নি। এখানে আসার পর যতক্ষন পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঘোষনা না করেছে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের কাছে বন্দী আছেন, ততক্ষন পর্যন্ত আমি মনে করতে পারি নি তিনি জীবিত আছেন। পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীর কামান, বন্দুক,ট্যাঙ্ক, মেশিনগানের গোলাগুলির মধ্যে বঙ্গবন্ধু আর বেঁচে নেই একথা ভেবে এবং সম্ভবত মেনে নিয়েই তো আমরা নিজ নিজ প্রাণ নিয়ে চলে এসেছি।

বঙ্গবন্ধু মুজিবের ছায়া হয়ে তার পাশে আজীবন রাজনীতি করেছি, জেলে থেকেছি। তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন দেশের জন্য জীবন দিতে। তিনি নিজেও বারবার বাংলার পথে প্রান্তরে বলেছেন, বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দিতে তিনি কুন্ঠিত নন। আজ যদি বঙ্গবন্ধু মুজিবের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাই, তাহলে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যেই আমরা পাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কে। আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিছুতেই পাকিস্তানিদের কাছে তার নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করবেন না, আত্মসমর্পন করবেন না এবং করতে পারেন না। এটাই আমার প্রথম ও শেষ বিশ্বাস।

বাংলাদেশ যদি আজ এত রক্তের বিনিময়েও স্বাধীন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য পাকিস্তানি দখলদারদের দাস ও গোলাম হয়ে থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানীর মর্যাদাও বাঙ্গালী কোনদিন আর পাকিস্তানীদের কাছে পাবে না। প্রভুভক্ত প্রাণীর মত আমরা যতই আনুগত্যের লেজ নাড়ি না কেন, পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানীদের আর বিশ্বাস করবে না, বিশ্বাস করার কোন প্রশ্নই উঠে না। আর এই অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রেসেডিন্ট হয়েও আসেন, তবু তিনি হবেন পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির পরান এক গোলাম মুজিব।

বাংলাদেশের জনগন কোনদিন সেই গোলাম শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে গ্রহন করবে না, মেনে নিবে না। আমার স্থির বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর পাকিস্তানীদের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। বাঙ্গালী জাতির গলায় গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দেবার পরিবর্তে তিনি নিজে বরং ফাঁসীর রজ্জু গলায় তুলে নেবেব হাসিমুখে। এটাই আমার বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এটাই আমার ঈমান। এ মূহর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া, আমাদের অস্তিত টিকিয়ে রাখার আর কোন বিকল্প নেই। বাঙ্গালীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর কোন অস্তিত্ব নেই, আর পরিচয় নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পরাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন না। গোলামের পরিচয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসবেন না কোন দিন। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করব। পরাধীন দেশের মাটিতে আমার লাশও যাতে ফিরে না যায় সে জন্য জীবিতদের কাছে আর্জি রেখে যাই। আমার শেষকথা, যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা বাংলার মাটিকে দখলদার মুক্ত করব। বাংলার মুক্ত মাটিতে মুক্ত মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরিয়ে আনব। মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেতে ফিরে আসবেন এবং তাকে আমরা জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনব ইনশাল্লাহ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ রক্ষার জন্য বিশ্ব মানবতার কাছে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি”

তাজউদ্দীন আহমেদের এই আবেগময়ী ভাষণের পর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে শিলিগুড়ি কনফারেন্স গর্জে উঠেছিল। নিষ্পত্তি হয় একটি বিভ্রান্তিমূলক ও আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রের। তবে সেটা ক্ষনিকের জন্য।

৫.

৩০ জুলাই মোশতাকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজী জহিরুল কাইয়ুম কলকাতা মার্কিন দুতাবাসে যোগাযোগ করেন। তিনি কুমিল্লার সাংসদ, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত জাতীয় পরিষদের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ক্রমিক-১৩৬)। আঞ্চলিকতার সুবাদে মোশতাকের ঘনিষ্ট। যেমন ছিলেন তাহেরউদ্দিন ঠাকুরও(পেশাভিত্তিক ক্রমিক-১৩১, উপদেষ্টা সদস্য বহিঃ প্রচার বিভাগ, তথ্য মন্ত্রনালয়)। এক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের (ক্রমিক নং-১৩৮) সচিব হিসেবে কামালউদ্দিন সিদ্দিকী (ক্রমিক-৫১০) দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করেছেন মাহবুবুল আলম চাষী (ক্রমিক-৬৬৯)। নভেম্বরে পুরো ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে চাষী পদচ্যুত হন। তার আগপর্যন্ত দিল্লী মার্কিন দুতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে মোশতাকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার দেনদরবার করছিলেন তিনি। ‘৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে দেনদরবার করেছেন একটি হেলিকপ্টারে করে মোশতাক ও খুনী মেজরদেরসহ যেনো যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যায় এই আবেদন নিয়ে।

চাষীর যোগাযোগে যদিও বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এমনকি মোশতাক নিজে যখন কথা বলেছেন মার্কিন দুতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে, তখন তার কথোপকথন শুনলেও মনে হবে বেশ দেশপ্রেমিক এবং বঙ্গবন্ধুভক্ত এই লোক। কিন্তু তার সত্যিকার মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায় মার্কিন দলিলপত্রে প্রকাশিত কাইয়ুমের কথাবার্তায়। প্রসঙ্গত, মাহবুবুল আলম চাষী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের খানিকটা নজরদারীতে থাকলেও কাইয়ুম অনেকদিন পর্যন্ত এ থেকে মুক্তই ছিলেন। যদিও তার কথাবার্তা অনেকক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর। বিশেষকরে মোশতাকের শিখিয়ে দেওয়া বক্তব্য তোতাপাখীর মতো উগড়ে দেওয়ার পর যখন নিজস্ব বক্তব্য রেখেছেন। নিজের গুরুত্ব বাড়াতে অনেক সময় অত্যন্ত গোপনীয় কিছু তথ্য তিনি ফাঁস করেছেন যা মুক্তিযুদ্ধের জন্য ক্ষতিকর ছিলো। এই অর্থে যে এসব তথ্যের ব্যবহার মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও দেখা যায়।

আবার সদর দপ্তরে কর্মরত নজরুল ইসলাম জহিরুল কাইয়ুম সম্পর্কে যা বলেছেন, তাতেও বিভ্রান্তি বাড়ে। তিনি দাবি করেছেন কাইয়ুম ছিলেন তাজউদ্দিনের ডান হাত। এবং কলকাতায় মার্কিন কনসুলেটে তিনি যে শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য দেনদরবার করছেন এটাও নাকি অপ্রকাশ্য কিছু ছিলো না। নজরুল আরো লিখেছেন যে শিলিগুড়িতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আয়োজনে কাইয়ুমের ভূমিকা ছিলো কারণ মোশতাক চাইছিলেন এটি আগরতলায় হোক। আর কাইয়ুমের পরিচিতি সম্পর্কে তার ভাষ্য : কাজী জহিরুল কাইয়ুম থাকতেন তার চাচা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের এককালের প্রভাবশালী সদস্য নবাব মোশাররফ হোসেনের পার্ক সার্কাসের নিকটবর্তী উডরোডস্থ বাসায়। অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের সাবেক পূর্ববঙ্গীয় নেতৃবৃন্দ ও তাদের আত্মীয়স্বজনরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে সার্বিক সমর্থন ও সহায়তা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। অবিভক্ত ভারতে সাবেক পূর্ববঙ্গে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস যারা করতেন কিংবা তারা এখন কোথায় আছেন এসম্পর্কে আমার কোনো ধারণা বা জ্ঞান ছিলো না। তবে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের (সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ার) কোর্স করতে গিয়ে সাবেক পূর্ববঙ্গীয় রাজনীতির অনেক অজানা তথ্য জানার এবং তৎকালীন পূর্ববঙ্গীয় রাজনীতির অনেক দিকপালের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। শুনেছি কুমিল্লার চিওড়ার কাজী বাড়ির বিখ্যাত নবাব মোশাররফ হোসেন ভারতীয় কংগ্রেসের একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস ও শিলিগুড়িতে শিলিগুড়ি হাউজ নামক বসতবাড়ী রয়েছে নবাব মোশাররফ হোসেন সাহেবের। এ পরিবার এবং কলকাতায় বসবাসকারী সাবেক পূর্ববঙ্গীয় জীবিত কংগ্রেস ও তাদের কংগ্রেসপন্থী আত্মীয়স্বজনরা দিল্লীর কংগ্রেস প্রশাসনের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের যোগসূত্র রচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নবাব মোশাররফ পরিবারের সঙ্গে দিল্লী কংগ্রেস নেতৃত্বের নাকি একরকম দুধ-ভাতের সম্পর্ক ছিলো। নবাব মোশাররফ হোসেনের পরিবারের সুবাদেই কাজী জহিরুল কাইয়ুম দিল্লীর কংগ্রেস মহলে প্রভাব বিস্তার করার মতো একটা কার্যকর পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি কোনো কোনো ব্যাপারে দিল্লীর কংগ্রেস লবি এবং কলকাতার মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতামত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে দূতের ভূমিকা পালন করতেন কাজী জহিরুল কাইয়ুম।

৬.

প্রকাশ্যে ডোন্ট কেয়ার এটিচুডধারী কাইয়ুম হয়তো এমন একটা ভাবমূর্তি দিয়ে গেছেন কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে। কিন্তু প্রকাশিত মার্কিন দলিলপত্র তার ভূমিকা ও ব্যক্তিরূপকে নতুন করে মূল্যায়িত করতে বাধ্য করে পাঠককে। ১ আগস্ট ১৯৭১ কলকাতার মার্কিন কনসুলেট থেকে যে গোপন তারবার্তাটি পাঠানো হয়েছিলো, তা বাংলায় তুলে দেওয়া হলো :

বিষয় : আওয়ামী লীগ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক

সারমর্ম : দুতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তার (পলিটিকাল অফিসার) সঙ্গে আলোচনায় আওয়ামী লীগ সাংসদ জানিয়েছেন আ.লীগ নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য উদগ্রীব এবং পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দাবিতে ছাড় দিতে প্রস্তুত। তারা ভয় পাচ্ছেন পাক-ভারত যুদ্ধের পরিনতিতে এবং গেরিলা যুদ্ধ যদি অব্যহত থাকে তাহলে বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব চরমপন্থীদের (এখানে কম্যুনিস্টদের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে) হাতে চলে যাবে। তিনি সুপারিশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-পাকিস্তান ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠকের। তবে সেখানে মুজিবের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক বলে জোর দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র পরাশক্তি যারা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।

  • ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের কুমিল্লার সাংসদ কাজী জহিরুল কাইয়ুমের একজন প্রতিনিধি দুতাবাসে ফোন করে কনসাল জেনারেলের সঙ্গে তার সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। সেটা সম্ভব নয় জানানো হলে তিনি যে কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কাইয়ুমের বৈঠকের ইচ্ছা জানান। ৩১ জুলাই কাইয়ুমের সঙ্গে দুতাবাসের পলিটিকাল অফিসার দেখা করেন।
  • কাইয়ুম সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২৫ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই ভারত এবং মার্কিনপন্থী। এখন মার্কিনীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ তাকে নির্বাচিত করেছেন তা পুনঃস্থাপন করতে। তিনি জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে পররাষ্ট্রসচিব আলমকে (মাহবুবুল আলম চাষী) নির্দেশ দিয়েছিলেন আমেরিকানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কিন্তু কিভাবে তা করতে হবে এ ব্যাপারে আলম ঠিক নিশ্চিত নন। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলমের যোগাযোগের ব্যাপারটা (রেফারেন্স টেলিগ্রামে সংযুক্ত) তার জানা এমন কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন তিনি, কিন্তু জোর দিয়ে বলেছেন যে এ ধরণের বৈঠক খুব গোপনে আয়োজন করতে হবে এবং যথাসম্ভব ভারত সরকারের অগোচরে।
  • জুলাইয়ের শুরুতে শিলিগুড়িতে আয়োজিত আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের বৈঠকে কাইয়ুম উপস্থিত ছিলেন এবং জানান যে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমত হচ্ছে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই সামাল দিতে পারে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের ওই বৈঠকে ১০ এপ্রিলের ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’র প্রতি আনুগত্য জানালেও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এখনও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার উপায় খুঁজছে। তার মতে যুদ্ধ তাদের সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বিশেষ করে যেখানে পাক-ভারত যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি কি হবে সেটি কেউ আগে থেকে বলতে পারছে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান, স্বল্প মেয়াদী ১৯৬৫ সালের যুদ্ধই কুমিল্লাতে তার ব্যবসা-বানিজ্যের বেশ ক্ষতি করেছিলো।
  • কাইয়ুম প্রচলিত ধারনাটাই নতুন করে তুলে ধরেন যে চলমান গেরিল যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে এর নেতৃত্ব চরমপন্থীদের হাতে চলে যাবে। তিনি বলেন যে পূর্ব বাংলায় শতকরা ১ ভাগ মানুষ কম্যুনিস্টদের সমর্থন করে। কিন্তু তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করতে। দমনপীড়ন যদি এহারে চলতে থাকে তাহলে মুক্তিফৌজে অংশ নেওয়া তরুণরা কম্যুনিস্টদের পাল্লায় পড়বে।
  • বাংলাদেশের (সরকারের) পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে কাইয়ুম বলেন যে সম্প্রতি মন্ত্রীসভার বেশ কয়েকটি দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ‘পুরো দিশেহারা অবস্থায়’ আছেন। তার মতে ‘মুক্তাঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই আসে না কারণ পূর্ব বাংলার উল্লেখযোগ্য অংশ দখলে রাখতে দুটো স্বয়ংসম্পূর্ণ (trained and equipped) সেনা ডিভিশন প্রয়োজন হবে। বরং মুক্তিফৌজ গেরিলা পদ্ধতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর পর্যায়ক্রমে আঘাত হেনে যাবে বলে তার ধারণা। তিনি জানান পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের কিছু ‘বন্ধু’ রয়েছে যারা পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রভাবিত করতে সাহায্য করতে পারেন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তান পূর্ব বাংলা বিষয়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে পারে। তবে কাইয়ুমের ভয় বিদেশী সাহায্যের কারণে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ হয়তো বর্তমান নীতি অব্যহত রাখবে যার পরিণতিতে পূর্ব বাংলা চরমপন্থীদের দখলে চলে যাবে।
  • যদিও পশ্চিম পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আর দেবে না বলে আশাবাদ তার, কাইয়ুম চান ইয়াহিয়া সরকারের সঙ্গে একটি আলোচনার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হোক মার্কিন সরকার। তার সুপারিশ হলো তাসখন্দ সম্মেলনের ধাঁচে একটি শীর্ষ বৈঠকের যেখানে প্রেসিডেন্ট নিক্সন, ইয়াহিয়া, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত থাকবেন এবং এটিই তার মতে পরিস্থিতি বাঁচাতে সেরা ও একমাত্র উপায়। এমন বৈঠক আয়োজনের জন্য প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে সেটা তার জানা, তবে তার ধারণা সবপক্ষেই সে উদ্যোগ নেওয়ার মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ রয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ মার্চ ১৯৭১ সালে নেওয়া তার আগের অবস্থান (পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা) থেকে অনেকখানি পিছু হঠতে ইচ্ছুক। উদাহরন হিসেবে তিনি বলেন পূর্ব বাংলায় কিছু অংশে অবাঙালীদের স্বার্থ নিশ্চিত ও নিরাপত্তা দিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বিষয়ে সমঝোতায় আসা সম্ভব। (এ বিষয়ে তার মতে গ্রহণযোগ্য হিসেবটা হলো পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা ৫ বা ৬টি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে একট বা দুইটি বেলুচ এবং দুয়েকটি পাঠান ব্যাটেলিয়ন।
  • কাইয়ুম জোর দিয়ে বলেন, যে কোনো ধরণের সম্ভাব্য সমঝোতায় মূখ্য ভূমিকা অবশ্যই শেখ মুজিবুর রহমানকে পালন করতে হবে কারণ একমাত্র তারই ক্ষমতা আছে পূর্ব বাংলার মানুষকে একাট্টা রাখার। যদি মুজিবের বিচার এবং মৃত্যুদন্ড হয় তাহলে সমঝোতার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণেই কাইয়ুম যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে আবেদন জানান যাতে শেখ মুজিবের নিরাপত্তার জন্য তারা সাধ্যমতো সব কিছু করেন।
  • কনস্যুলেট জেনারেল গর্ডনের মন্তব্য : কাইয়ুম একজন ভদ্র এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে পোল.অফকে মুগ্ধ করেছেন এবং তার বিশ্বস্ততা নিয়ে আমাদের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই (তার বাংলাদেশের পরিচয়পত্র ছিলো এবং ঢাকা কনসালজেনারেল আমাদের তার বায়োডাটা পাঠিয়েছেন)। আমরা অবাক হয়েছি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সঙ্গে তার মতামতের বৈপরীত্য দেখে। আমাদের ধারণা বর্তমান ঝঞ্ঝাটময় পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব হাতের পাঁচ হিসেবে বিকল্প উপায় খুঁজছে আর সুবাদেই তারা একটা সমঝোতায় আসার জন্য উদগ্রীব এবং সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। যদিও কাইয়ুমের দাবি যে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মনোভাবই তিনি ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু সত্যিই শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এমন সমঝোতামূলক ভাবনা ভাবছেন কিনা সেটা নিশ্চিত করা জরুরী। সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তা কাইয়ুমকে জানিয়েছেন যে আমরা এই বৈঠকের খবর উপরের মহলে নিশ্চিতভাবেই জানাবো, তবে তাকে কোনো ধরণের পাল্টা সাড়া আশা করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কাইয়ুম ইঙ্গিত দিয়েছেন পরের সপ্তাহে আবার যোগাযোগ করার। আমাদের উচিত হবে তার সঙ্গে গোপনে এবং নিম্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যহত রাখা।

এ বিষয়ে পরবর্তী টেলিগ্রামে সংযুক্ত ঢাকা কনস্যুলেটের তারবার্তাটি উল্লেখ করা যেতে পারে : The Consulate General in Dacca did an assessment of Qaiyum’s role in the Awami League and concluded that he was not prominent in the leadership but was probably a confidant of Khondkar Mushtaq Ahmad, the “Foreign Minister” of the Bangladesh independence movement, and a bona fide representative of Mushtaq. (Telegram 3057 from Dacca, August 8; National Archives, RG 59, Central Files 1970–73, POL 23–9 PAK)

সূত্র :

একাত্তরের রণাঙ্গন কিছু অকথিত কথা (নজরুল ইসলাম)

মূলধারা ‘৭১ (মঈদুল হাসান)

বাম রাজনীতির ৬২ বছর (ফাইজুস সালেহীন)

ক্রাচের কর্ণেল (শাহাদুজ্জামান)

একাত্তরের রণাঙ্গন কিছু অকথিত কথা (নজরুল ইসলাম)

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান (সামছুল আরেফিন)

Foreign Relations of the United States, 1969–1976

Volume XI, South Asia Crisis, 1971

সংক্ষিপ্ত লিংক http://combostruct.com/4HtK