রোশেনারা : বোন আমার বাংলাদেশের পতাকা…

মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতাদের সাক্ষ্য শুনেছেন কেউ! শুনলে জানতেন আমাদের মেয়েদের নিয়ে কিরকম খেলতো পাকিস্তানী পিশাচরা। না, সে খেলাতেও রাজনীতি ছিলো না। খেলার সঙ্গে রাজনীতি থাকে না। সে খেলায় ছিলো শুধুই হিংস্রতা, নির্মমতা, ক্রুঢ়তা এবং পাশবিকতা। হাসতে হাসতে কারো বুকের মাংস কেটে নেয়া কিংবা তলপেটের নীচে বেয়নেটের মোচড়। যাদের সঙ্গে এমন হতো, তারা আসলে ভাগ্যবতী। মরে বেঁচে যেতেন। আর বাকিরা বাঙালী নারী হওয়ার প্রায়শ্চিত্য করে যেতেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সেপাই থেকে জেনারেলে।

রোশেনারা এদের কারো মতো হতে চায়নি। সে শুধু চেয়েছিলো রাণী পদ্মাবতীর মতো নিজের সম্মাণটুকু রাখতে, একতাল মাংসপিন্ড হয়ে যাওয়ার আগে সে শুধু একটা স্বপ্নই দেখেছিলো। যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা সে ওড়াতে পারেনি, তা যেন হাতে ওঠে তার উত্তর প্রজন্মের নারীকুলে। বাঙালী মেয়েরা যাতে গর্বভরেই দোলায় ওই লাল-সবুজ। খিলখিলিয়ে তখন হাসবে আমাদের বোন সেই পতাকা হয়ে।

কে রোশেনারা? শুদ্ধ উচ্চারণে হয়তো রওশনআরা। গ্রাম-বাংলায় তা-ই রুশেনারা কিংবা রোশেনারা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ কালে এই রোশেনারাই ছিল ট্রেঞ্চে ট্রেঞ্চে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার এক অসম্ভব ভালোলাগা প্রত্যয়ের নাম। রোশেনারার মতো একজনকে বোন ভেবে গর্বে বুক ফুলে উঠত তাদের। শরণার্থী শিবিরগুলোতেও তাই, তারা উদ্দীপ্ত হতো তেজোদ্দীপ্ত এক বাঙালী মেয়ের দূরন্ত সাহসীপনায়। কে এই রোশেনারা? কি করেছিলো সে? রোশেনারা মুক্তিযুদ্ধকালে এই বাংলার প্রতিটি নারী। আমাদের সেই প্রিয় বোন, যে পেয়ারার ডাল থেকে নেমে এক ছুটে পেরিয়ে যেত সরিষা ক্ষেত ফেলে কাশবন। ফের এসে উঠোনে তার এক্কাদোক্কা, ছি-কুত-কুত। আড়চোখে চেয়ে দেখা বৈঠকখানায় মাদুরপেতে সার বেধে শুয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের কিছূ লাগবে?… মিয়াভাই, এইডা কি?… স্টেনগান?… ক্যামনে গুলি করে? …বাবারে এত্তো ভার! …এক গুলিতে অনেকডিরে মারবা ক্যামনে? এই চ্যাপ্টা লোহাডা কি? মাইন দিয়া কি করে? ক্যামনে! ক্যামনে! ও মিয়া ভাই কও না ক্যামনে।…. ওরে পাগলী তোর সব জানতে হইবো? বাহ, পাকিরা আইলে আমিও যুদ্ধ করুম না বুঝি! চারপাশে হাসির হুল্লোরে লাল হয়ে যায় গালদুটো, চোখে কি জলও জমে অভিমানী!

একদিন সত্যিই তারা আসে। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় আস্তানা আছে। ভারী অস্ত্রসস্ত্রের ডিপো। তাই তারা ট্যাংক নিয়ে আসে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তো নেই। দূর গাঁয়ে, অন্য অপারেশনে। শুধু গুলির বাক্স, কিছু গ্রেনেড আর গোটা দুয়েক মাইন ফেলে গেছে তারা রোশেনারার জিম্মায়। দিশেহারা হয়ে সে সেগুলো আগলে চলে যায় দূরে, ঝোপের কোনে। সেখান থেকেই দেখে আগুন, গুলি, আর্তনাদ। দেখে আদবর কাকুকে কিভাবে লাশ বানিয়ে ফেললো ওরা। কিভাবে ওর খেলার সাথী ফুলিকে উঠোনে ফেলে…। ঘরঘর চাকার শব্দে এগোচ্ছে লৌহদানব। ওদের ভিটের দিকেই। নিশ্চিত হওয়া গেছে এটাই মুক্তিদের আস্তানা। রোশেনারাকে পেলে কি ফুলির মতো করবে ওরা? খুবলে খাবে?

… শোন, এই যে আংটা দেখতেছোস, এইডা ধইরা টান দিলেই এই লোহার বাডি বোমা হইয়া যাবে। তয় মাইনষের গায়ে মাইরা লাভ নাই। এই লোহা লোহা খায়। লোহার গায়ে লাগাইতে হবে।… মিয়া ভাইর কথাগুলো কানে বাজে রোশেনারার। আচলে ঢেকে নেয় একটা মাইন। আগুয়ান ট্যাংক এবং তার পাশে থাকা মিলিটারিরা দেখে ফুলের মতো সুন্দর এক কিশোরী তাদের দিকে ছুটে আসছে। শিকার নিজেই যখন শিকারীর দিকে আসে তখন সে একটু থমকায় বৈকি। এরপর তারা চোখ বড় বড় করে দেখে কিভাবে চপলা সে কিশোরী বাজপাখী হয়ে যায়, জ-অ-য় বাং-লাআআ আওয়াজে ঝাপিয়ে পড়ে ট্যাংকের গায়ে, টারেটের নীচে। প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ। এরপর সব সুনসান। পড়ে থাকে পোড়া ট্যাংক, ছিন্নবিচ্ছিন্ন কিছু পাক সেনা। দূরে আদবর কাকু, ফুলির নিথর দেহ। রোশেনারার রক্তমাখা সবুজ শাড়িটাই শুধু ট্যাংকের ব্যারেলে বাংলাদেশের পতাকা হয়ে যায়।

সে পতাকা দুলিয়ে তার খবর পৌছে দেয় বাতাস। তাকে নিয়ে গান বাঁধে মাঝি। নৌকা বাইতে বাইতে মুখে মুখে সে গান ছড়িয়ে যায় পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়।

কাহার ঘরের ঘরণীগো ছিলে কন্যা কার…দেশের লোকে জানে তুমি মেয়ে যে বাংলার…

তাকে নিয়ে কবিতা লেখেন কবি। এ বাংলায়-ও বাংলায়। সে কবিতা মুখে মুখে ফেরে, ইথারে ভেসে আসে ট্রেঞ্চে ট্রেঞ্চে। চোখের পানি সামলে, ট্রিগার আঁকড়ে সামনে পানে চায় রোশেনারার মিয়াভাইরা। তারপর দেশ স্বাধীন হয়, জাতীয় পতাকা হয়ে দোলে রোশেনারার রক্তমাখা সবুজ শাড়ি। শুধু তার স্বপ্নটাই বোধহয় সত্যি হয় না। কিংবা রোশেনারা নিজেই হয়তো মিথ্যে, কোনো অলীক আখ্যান। তাই হয়তো এই ডিসেম্বরে বাঙালী মেয়েরা পাকিস্তানের পতাকা দোলাতে দুবার ভাবে না, উগ্রলালসায় বরং শয্যায় চায় পাঠান শরীর। দূরে সেই মিথ্যে সেই অলীক দেশে হয়তো ঘৃণায় কুকড়ে এতটুকু হয়ে যায় রোশেনারা।

একটি মেয়ের মৃত্যু / প্রীতীশ নন্দী

রোশেনারা মারা গেছে, মনে রেখো।

নদীর মেয়ে রোশেনারা, প্রতিহিংসার সূর্য আমাদের, রাত্রির স্তরের ওপর তুষারীভূত দুটো চোখ- রোশেনারার শান্ত চোখদুটোর কথা মনে করো- এরপরও যদি তুমি হিংসার প্রসঙ্গ তোল তবে আমি তোমাকে ওর চূর্ণ বিচূর্ণ বাহুদুটোর উচ্চারিত ভয়ঙ্কর প্রশ্নটির দিকেই দেখিয়ে দেব।

আর তারপর ইবলিস যদি তোমার পথ প্রদর্শক হয় তবে আমি সেই নীল নিঃস্তব্ধতার দিকেই তোমাকে এগিয়ে যেতে বলব যা রাত্রির কামনা নিয়ে জ্বলতে থাকে যখন লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাভ রক্তগোলাপ ওর চোখের সামনেই ঝরে যায়।

মনে রেখো আজ রাতে রোশেনারা মারা গেছে
আর নিজের মরা চোখ দুটোই ওর সেই নীরবতা পালন করছে।

দূরের গ্রামগুলো যখন বন্দুকের আওয়াজে শব্দিত হয়ে উঠবে, ওর খোঁপায় গোঁজা অঙ্গারীভূত লাইলাক ফুলটা রাতের জাফরিতে বুনে দেবে সাহস। সময়ের সেনানী-সবুজ রূপকথাগুলো রোশেনারার বরণ করা মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করবে না আর।

একটা ট্যাঙ্ক একটা জীবনের সমান : হ্যাঁ রোশেনারা ওই দাম ওর। গ্রীষ্মের মূল্য ও শতলক্ষ নিহতের, পর্বতপ্রমাণ ধর্ষণ আর শঙ্খ চিলের মৃত্যুর

আর যদিও সাতটি রাত্রির পৈশাচিক ভীষণতা জুড়ে প্রাচীনতম নদীটি জ্বলছে- ভস্মীভূত বৃক্ষ আর নাপাম বোমাহত পাখিটা নীরবে অপেক্ষামান, যদিও তোমার অন্তহীন প্রশ্নগুলো চুয়াডাঙার জনহীন পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাবনা মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা, সিলেট প্রাণহীন আর চট্টগ্রাম হলুদ-নদীর অপরপারে অপেক্ষামান-

তবু মনে রেখো, রোশেনারা মারা গেছে
আর তার মৃত্যুই চূড়ান্ত।

রোশেনারা / সামসুল হক 

তোমার বয়স কতো, আঠারো উনিশ?
মুখশ্রী কেমন? রঙ চোখ চুল কী রকম? চলার ভঙ্গিমা?
ছিল কি বাগান, আর তোমার মল্লিকা বনে ধরেছিল কলি?
ছিলে তুমি কারো প্রতিমা?
জানি না।

না, জানি।
পৃথিবীর সব মাস সব দিন তোমার হাতের মধ্যে এসে গিয়েছিল,
দুপুরের মতো মুখ, রৌদ্রদগ্ধ চোখ, পায়ে চৈত্রের বাতাস,
তোমার বাগানে-
কলোনি স্বদেশে- ধরেছিল সাড়ে সাত কোটি মল্লিকার কলি,
তুমি ছিলে মুক্তির প্রতিমা।

ওই বুকে মাইন বেঁধে বলেছিলে- জয় বাংলা-
মানুষের স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক,
ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলেছিলে-
বর্বরতা এইভাবে মুছে যাক, ধ্বংস হোক সভ্যতার কীট।
অন্তিমবারের মতো পথিকেরা পথে এসে দাঁড়িয়েছে, আকাশে উঠেছে ধ্রুবতারা-
ধ্রুবতারা হয়ে গেছে মুক্তির জননী রোশেনারা।

ব্লগার ত্রিশোংকুর তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তি:

১৯৭১ এ পাকির সাথে যুদ্ধরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম দুটি গোলন্দাজ উপদল (ব্যাটরি-একেকটিতে ছ’টি করে কামান থাকে) প্রথমটির নাম রাখা হয়েছিল মুজিব ব্যাটরি যা এখন ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি আর দ্বিতীয়টির নাম রাখা হয়েছিল রওশন আরা ব্যাটরি যা এখন ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি।.

কৃতজ্ঞতা: পোস্টটির জন্য আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা মাহবুবুর রহমান জালাল ভাইর কাছে। অমর পালের গাওয়া দূর্লভ গানটি এবং সৈয়দ শামসুল হক ও প্রীতিশ নন্দীর কবিতা (মূল কবিতাটা ইংরেজীতে যা অনুবাদ করেছেন শিশির ভট্টাচার্য্য, ’৭১ এ কলকাতায় ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’ নামের একটা সাময়ীকিতে প্রকাশিত হয়েছিলো) দুটো তার কাছ থেকেই উপহার পেয়েছিলাম।
প্রচ্ছদে অসাধারণ পেইন্টিংটি একেছেন তাপস সরকার। মন্তব্যে তার কাছে একটি ছবি চাওয়া হয়েছিলো, তিনি প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। সেটা ব্যবহার করছি অশেষ কৃতজ্ঞতা সহকারে।