গোলাম নামা: আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে ব্যাপক মিথ্যাচার-৩

[ এই পর্বে যাওয়ার আগে পাঠকদের একটা বিষয়ে না জানালেই নয়। ১৩ ডিসেম্বর রাতে গোলাম যে সাফাইটি দিলো এখন মোটামুটি পরিষ্কার তা কাদের জন্য। সম্প্রতি ব্যর্থ হওয়া যে সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা জামাত নিয়েছিলো হিজবুত তাহরীরকে ঢাল বানিয়ে, তা থেকে লাভবান হতো একটি দলই, জামাতে ইসলামী। এবং বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে যেতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটির নেতৃবৃন্দ।

গোলাম তার বয়ান দিয়েছে জাতিকে তার নিরপরাধের সাফাই দিতে নয়, বরং ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিলো তার। একইসময়ে আরো একাধিক সাক্ষাতকার নামী ও বেনামী কিছু মাধ্যমের মারফতে ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই পরিকল্পিত সাক্ষাতকারটির বেশীরভাগ কথাই পুনরাবৃত্তি মাত্র। ছাত্র শিবির ও জামাতের প্রতিটি সমর্থকের জন্য যে বইটি পড়া ফরজ, তা হচ্ছে ‘জীবনে যা দেখলাম’। ৮ খন্ডের এই বইটি মূলত গোলামের আত্মজীবনি বলে প্রচারিত। এর তৃতীয় খন্ডে মুক্তিযুদ্ধে তার এবং দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলো গোলাম যা ছিলো একইরকম মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ (পোস্টে এর অনেক উদ্ধৃতি সঙ্গত কারণেই ব্যবহৃত)। মূলত যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে বাচতে এবং সমর্থক ও সদস্যদের চোখে মহান ইসলামী ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এই মিথ্যাচার গোলাম এবং জামাতের খুনী নেতাদের জন্য জরুরী ছিলো। জামাত-শিবিরের প্রতিটি সদস্য এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষর বিশ্বাস করে এবং সেভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন করে। ১৩ ডিসেম্বরের সাক্ষাতকারে সেই পুনারাবৃত্তি আসলে তাদের সেই বিশ্বাসকে আরো জোরদার করতে, যাতে গ্রেফতার হলে এবং সেটা ঠেকাতে সামরিক অভ্যুত্থানে জামাত ও শিবির কর্মীরা জান কবুল করে দেয়। আশা করছি না এই লেখা পড়ে তাদের কোনো একজন যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটা দ্বিতীয়বার ভাববে, বরং গোলামের মিথ্যাচারকে সহী ধরে নিয়ে আমার এই পোস্টের বর্ণনাকেই চরম মিথ্যে বলে রায় দেবে। বাট এগেইন দ্যাটস হোয়াই গোলাম আযম ইজ আ প্রফেসর, প্রফেসর অব প্যাথলজিকাল লাইজ, সো শুড বি হিজ ফলোয়ারস। বইটির উল্লেখ আরেকটি কারণে জরুরী ছিলো, অনেকেই ভাবতে পারেন টিভির সামনে কথা বলতে গিয়ে বয়সজনিত কারণে অনেক বিষয়ে হয়তো সময়-তারিখ ভুল বলেছে গোলাম, কোনো ব্যাপারে স্মৃতিবিভ্রান্তিতে ভুগেছে। এই ভাবনাটা মিথ্যে, গোলামের আত্মজীবনী ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়েছে, তার আগে দৈনিক সংগ্রামে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছে। আগেই বলেছি, ১১ বছর আগের এই মিথ্যেবাদিতার সঙ্গে ১৩ ডিসেম্বরের টিভিবয়ানের হুবহু মিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরের সময়ে ঘটা বহু ঘটনা নিয়েও সে মনগড়া ইতিহাস বলেছে, কিন্তু সেগুলো আমলে না নিয়ে প্রাসঙ্গিক থাকলাম। ]

সাংবাদিকঃ তারা বলেছেন যে ২৫ মার্চ যে সার্চ লাইট একটা অপারেশন হয়েছিল, অপারেশন সার্চ লাইট, এর ঠিক ৪ দিন পরে আপনি এবং আপনার নেতৃত্বে কয়েকজন গিয়ে টিক্কাখানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন (৪ঠা এপ্রিল).

গোলাম আযমঃ আমার নেতৃত্বে না, নূরুল আমীন সাহেবের নেতৃত্বে। নেজামে ইসলাম পার্টি, মুসলিম লীগ; আমরা ওনার সঙ্গে দেখা করে বললাম যে, এই যে ২৫শে মার্চে যে আচরণ করা হয়েছে পাবলিককে মারা হয়েছে, এটা করলে তো জনগনের সমর্থন আপনারা পাবেন না, এটা কেন করলেন? তিনি বললেন যে, যে বিদ্রোহ হয়েছে, এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য এটা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। মানে নয়া বাজার পুরাই পুড়াইয়া দিয়েছে, ঐ যে কাঠের দোকান গুলো ছিল, এখন কি কাঠের দোকানগুলি আছে কি না আমি জানি না, সেগুলি সব পুড়াইয়া দিয়েছে, তারপরে শেল নিক্ষেপ করেছে, আমার বাড়ীতেও শেল এসে পড়েছে, তো, উনি বললেন যে আর হবে না, এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য এটা করতে বাধ্য হয়েছি। তো, আমরা বললাম যে দেখেন, সেনাবাহিনী ময়দানে নামলে বাড়াবাড়ি তারা করে, দেশের সেনাবাহিনী দেশের জনগনের সঙ্গেও বাড়াবাড়ি করে, তো বাড়াবাড়ি করলে জনগন প্রতিকারের জন্য কার কাছে যাবে? রাজনৈতিক দলের কাছেই তো আসবে। তো, যেহেতু আ’লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সব দেশ থেকে চলে গেছে সব ভারতে, এখন আমাদের কাছে তারা আসে, আমরা তাদেরকে কি করবো? আমরা এটুকু সুযোগ চাই যে, আমাদেরকে এ সুযোগ দেন, আমাদের কাছে যদি কোন কমপ্লেইন আসে, তাহলে যেন সে কমপ্লেইন আপনাদের কাছে পেশ করতে পারি এবং প্রতিকার করা সম্ভব হয়। তো ব্রি: রাও ফরমান আলী খান, উনি বসতেন গভর্নর হাউজে, যদিও টিক্কা খান গভর্নর ছিলেন এবং চীফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন, ইনি বসতেন ক্যান্টনমেন্টে। আমরা সেখানেই দেখা করেছি তার সঙ্গে। তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফরমান আলী খানকে হুকুম দিলেন যে জরূরী টেলিফোন সব দিয়া দেন, যাতে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং কমপ্লেইন করতে পারে এবং এটার জন্যই শান্তি কমিটি করা হয়েছিল, শান্তি কমিটির কাজ এটাই ছিল।

সিরিয়ালি আসা যাক। ৪ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ১২ জন ইসলামপন্থী দলের সাক্ষাতের কাহিনী প্রথম পর্বেই আলোচনা হয়েছে, সেখানে কি কি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে সেটাও উল্লিখিত। বিস্তারিত বলা হয়েছে শান্তি কমিটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও । তবে গোলামের ভার্সন ভিন্ন। আত্মজীবনিতে সে এই কমিটি গঠনের দায় চাপিয়েছে মৌলভী ফরিদের উপর, যে কিনা জামাতের সঙ্গে মতপার্থক্যের জন্য আলাদা ভাবে ‘ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি’ খুলেছিলো মওলানা নুরুজ্জামানকে সাথে নিয়ে। একইভাবে গোলাম বইয়ের মতো টিভিবক্তব্যেও এড়িয়ে গেছে টিক্কা খানের সঙ্গে শান্তি কমিটি বিষয়ে এক সপ্তাহে তিন তিনবার সাক্ষাতের কথা (যা প্রমাণসহ দাখিল করা হয়েছে প্রথম পর্বে)। কারণটা ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। শান্তি কমিটির অন্যতম সংগঠক এবং শীর্ষ নেতা হিসেবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে যে যুদ্ধাপরাধের দায় তার ওপর চাপে সেটা মিথ্যাচারের মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া। প্রসঙ্গত যে কথাটা না বললেই নয়, নুরুল আমিনের নেতৃত্বে টিক্কা খানের কাছে গেলেও শান্তি কমিটির কোনো পদেই নুরুল আমিন ছিলো না। নিচে ৭ এপ্রিল বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটি সরকারী প্রেসনোট, যেখানে বলা হয়েছে গোলাম আযম আগের দিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিল আলাদাভাবে টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং অন্যদের মতো সেনাবাহিনীকে সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দুই সাক্ষাতে মাত্র একদিনের গ্যাপ! অথচ কথা সেই একই- সবধরণের সহযোগিতা!

 

…এবং আমিতো অনেক লোককে সেভ করেছি, তাদেরকে জীপ থেকে উদ্ধার করেছি। একজন এখনো বেঁচে আছেন, সাইফুদ্দিন (পাশে একজনকে প্রশ্ন করে গোলামা জানতে পারে সে অনেক আগেই মারা গেছে ) । আমি দুপুরে খাচ্ছি, তার ওয়াইফ এসে বারান্দায় কান্নাকাটা করছে। কি ব্যাপার? বললো যে ওনাকে ধরে নিয়া গেছে, তো আমি পার্টিকুলারস নিলাম। রাও ফরমান আলী আমাকে বলেছিলেন যে সার্কিট হাউজে ব্রিগেডিয়ার কাশেম বসে, কোন কমপ্লেন হলে ওনার কাছে আগে বলবেন। আমি ওনাকে ফোন করলাম। এরপরে, দু’দিন পরে বোধহয়, ঐ লোকের নাম সূর্য মিয়া, ডাক নাম ছিল সূর্য মিয়া, উনি আমার বাড়ী এসে পৌছলেন। আমি জিজ্ঞাস করলাম, কেমন করে আসলেন, কিভাবে আসলেন? বললেন যে সার্কিট হাউজের ওখানে আর্মির গাড়ীতে আমাকে নিয়া আসছে, এবং লাথি দিয়া আমাকে গাড়ী থেকে ফেলে দিয়েছে, এ কথা বলে যে, গোলাম আযম নাকি কে সুপারিশ করছেন তোর পক্ষে, তো যা, এই বলে গাড়ী থেকে লাথি দিয়া আমাকে ফেলে দিল, আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম, তারপর যখন নাকি সেন্স ফিরেছে তারপরে একটা রিক্সা ডেকে আমি ডাকলাম, এই রিক্সাতে উঠে আপনার বাড়ীতে আসছি। এইভাবে মানুষের যেটুকু সম্ভব খেদমত করেছি।…

অনেক লোকের কথা গোলাম বলেছে বটে, কিন্তু তার জীবনে একটাই উদাহরণ দেখা গেছে সেটা সূর্য মিয়া। গোলামের আত্মজীবনীতেও একই কাহিনী একইভাবে পরিবেশিত হয়েছে। নামটা সে সময়কার প্রথা অনুযায়ী সুরুজ মিয়া না হয়ে স্মার্টলি সুর্য রাখার পিছনে একটু বাঙালীয়ানা (মানে হিন্দুয়ানা) জাতীয় কৌশলী ব্যাপার আছে। সেটা আরেকটু প্রকট হয় যখন আত্মজীবনীতে গোলাম লেখে: ডাক নাম সূর্য মিয়া, আসল নাম সম্ভবত (!) সাইফুদ্দিন। ফার্স্ট ক্লাস কনট্রাকটর। শেখ মুজিবের আত্মীয়। আরও জানলাম সুর্য মিয়া আমার ছোট ভগ্নিপতি মগবাজারের কাজী সাহেবের সাথে সম্পর্কে খালাতো ভাই। কাজী সাহেবকে ফোন করে জানলাম যে খুবই ভালো লোক। রাজনীতির ধারে কাছেও নাই। শেখ মুজিবের আত্মীয় হওয়া ছাড়া তার আর কোনো অপরাধ নাই। (যাক লতায় পাতায় গোলাম আযমও শেখ মুজিবের আত্মীয় বের হলো তার এই দাবিনামায়!)। কাহিনীতে থার্ড টুইস্ট, তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে। তো এক ঢিলে গোলাম তিন পাখি মারলো এই উপকারী উদাহরণ দিয়ে, বোঝালো মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কিংবা বাঙালী নাম সমস্যা না (শান্তি কমিটির দায়িত্ব নিয়ে গোলাম প্রথম যে কাজ করেছে তা হলো ঢাকা শহরের ২০৪টা সড়ক, লেন ও রাস্তার নাম বদলিয়ে মুসলমানি নাম রাখা)। এমনকি মুজিবের আত্মীয় হলেও তাকে বাঁচাতে কার্পন্য করেনি সে। আত্মজীবনিতে এই কাহিনীতে আরো বাড়তি ব্যাপারস্যাপার আছে। ভীত সুর্য মিয়া বাড়িতে না ফিরে তার চার যুবতী কন্যাসহ গোলামের বাসাতেই আশ্রয় নেয়। একমাস পর পাশের বাড়ির দোতলা ভাড়া করে তাদের রাখে গোলামের ছোটো ভাই মোকাররম। এবং সুর্য মিয়া প্রতিদান চুকায় বিজয়ের পর। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হামলার আশঙ্কায় গোলামের পরিবার পরিজন তার বাড়িতেই আশ্রয় নেয়।


বাস্তবে আমরা সিরু মিয়া নামের একজনের অস্তিত্ব খুজে পাই । পবিত্র রমজানের শুরুতে আনোয়ারা নামে একজন মহিলা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় মোহসিনকে ধরে গোলাম আযমের সাহায্যপ্রার্থী হয়। খিলগাও গভর্মেন্ট হাইস্কুলের শিক্ষক মোহসিন গোলামের দুই ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতেন। আনোয়ারার আর্জি ছিলো তার স্বামী দারোগা সিরু মিয়া এবং একমাত্র ছেলে ক্লাস এইটের ছাত্র আনোয়ার কামালকে পাকিস্তানীদের হাত থেকে বাঁচানো যাদের কুমিল্লা জেলে রাখা হয়েছে। গোলাম সব শুনে একটি চিঠি লিখে দেয় এবং সেটা কুমিল্লা জেলা রাজাকার প্রধানকে দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়। ১ নভেম্বর আনোয়ারার ভাই ফজলু চিঠিটি নিয়ে কুমিল্লা যান, রাজাকার কমান্ডারকে চিঠি দেন। সে চিঠি পড়ে জানায় ঈদের পরদিন সিরু মিয়া আর তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। প্রতিশ্রুতিমতো ফজলু ঈদের পরদিন কারাগারে গেলে তার হাতে সিরু মিয়া ও কামালের জামা-কাপড় তুলে দেওয়া হয়। ঈদের দুইদিন আগে তিতাসের পাড়ে ৪০ জন স্বাধীনতাকামীর সঙ্গে গুলি করে মারা হয় সিরু মিয়া ও তার ১৪ বছর বয়সী সন্তান কামালকে। গোলাম চিঠিতে লিখেছিলো: এই মহিলাকে তার স্বামী ও সন্তানের কাপড় ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। কতটা নির্মম হলে মানুষ এমন রসিকতা করতে পারে!

 

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ৬২টি অভিযোগের মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ড সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ, সেটি এই সিরু মিয়া ও তার সন্তানের হত্যাকাণ্ড। গোলামের এই চিঠিটির উল্লেখ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং। ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তখনকার বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় তিনি গোলাম আযমকে সিরু মিয়া হত্যাকাণ্ডের দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেন:

মাননীয় স্পিকার,এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক বিষয় যে এতদিন পর আমাদের প্রমাণ করতে হচ্ছে যে গোলাম আযম রাজাকার প্রধান ছিলেন কিনা? গোলাম আযম যে একজন হত্যাকারী ছিলেন, তার একটি প্রমাণ আমি এখানে দিচ্ছি। হোমনা থানার প্রতিনিধি নিশ্চয়ই এখানে আছেন। কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব সিরু মিয়া দারোগা ও তার কিশোর পুত্র আনোয়ার কামালকে গোলাম আযমের লিখিত পত্রের নির্দেশে হত্যা করা হয়। সিরু মিয়া দারোগা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ট্রেনিং ও অপারেশন চালাতেন। ‘৭১এর ২৭ অক্টোবর সিরু মিয়া দারোগা এবং তার কিশোর পুত্র আনোয়ার কামাল মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার সময় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। সিরু মিয়া মুক্তিযুদ্ধে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ করেছিলেন যে তিনি আমাদের প্রবাসী বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের স্ত্রী বেগম তাজউদ্দিনকে সপরিবারে কুমিল্লা সীমান্ত পার করে পৌছে দিয়েছিলেন। সেই সিরু মিয়াকেও গোলাম আযমের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিলো। তার নজির ও প্রমাণ (একখানা কাগজ দেখিয়ে) এই কাগজে রয়েছে। আপনি চাইলে এই কাগজও আপনার কাছে দিতে পারি।

গোলামের নির্দেশনামার নজীর ও প্রমাণ কিংবা তার অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। এবং এই একটি অভিযোগই তাকে ফাঁসিতে চড়ানোর জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। গোলামের বড়াই শুনে আরেকটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা না জানিয়ে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলামও মার্চের সেই দিনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মগবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায়। তিনি ভারত যাওয়ার পর তার পরিবার ছিলো সেখানে, গোলাম আযম ছিলো তার প্রতিবেশী। ২৫ মার্চের আগে গোলামের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছেন নজরুল। অথচ ২৭ মার্চ সেই বাড়িটি ঘেরাও করে মেশিনগানের গুলিবর্ষন করেছে পাকবাহিনী । বর্তমান মন্ত্রী আশরাফুল ইসলাম ও তার ভাইরা দেয়াল টপকে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। গোলাম আযম এগিয়ে আসেননি তার বিপন্ন এই প্রতিবেশীদের বাঁচাতে। অথচ সে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সন্দেহে আটক শেখ মুজিবের এক আত্মীয়কে রক্ষা করে বলে মিথ্যে গল্প ফাঁদে। সারা দেশে আর একজন মানুষও নাই যে এগিয়ে এসে বলবে যে গোলাম আযম আমাকে বা আমার পরিবারকে মুক্তিযুদ্ধের সময় রক্ষা করেছিলো! অথচ সিরু মিয়ার সঙ্গে সূর্য মিয়ার ঘটনার কি কাকতালীয় মিল, শুধু গোলামের ভূমিকাটুকু বাদে।

…যারা অন্যান্য পার্টির লোক ছিল, মুসলিম লীগ ছিল, ডেমোক্রেটিক পার্টি ছিল, নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল, আমি এরকম অভিযোগ পেয়েছি যে তারা এরকম কমপ্লেইন করে কিছু কামাইও করেছে, খেদমত করেছে কিন্তু টাকা পয়সা কামাইও করেছে। তো এই কাম তো আর আমি করতে পারি নাই। তো এভাবে আমরাতো আর কিচ্ছুই করতে পারি নাই।…

গোলাম আযমের উচ্চাকাঙ্খা এসব খুচরা লাভের আশায় আটকে ছিলো না। তার স্বপ্ন ছিলো জামাতকে আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট মুক্ত পূর্ব পাকিস্তানে এক নম্বর রাজনৈতিক দল হিসেব প্রতিষ্ঠা। সুবাদেই প্রধানমন্ত্রীর মতো বড় পদে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তার ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী করতে হবে’ দাবিতে সাড়া দিয়ে যখন নুরুল আমিনকে বিবেচনায় আনলো ইয়াহিয়া, গোলাম তাতে সমর্থন দিলেও খুশী মনে মেনে নেয়নি। আর নুরুল আমিনের পিডিপি স্বয়ং অভিযোগ এনেছে জামাতের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের (দ্বিতীয় পর্বে)। নভেম্বরের শেষটুকু দীর্ঘ লবিং করেও গোলামের ভাগে শিকে ছেড়েনি। বরং ভু্ট্টো পরিহাসের সুরেই বলেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের কিছু বাতিল নেতা ক্ষমতার ভাগ নিতে দিনরাত লাহোর-ইসলামাবাদ-করাচি করে যাচ্ছে অথচ এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের উচিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের পাশে থাকা, সেখানেই তাদের বেশী প্রয়োজন।’ পিপিপির ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী ১১ নভেম্বর এক বিবৃতিতে সরাসরিই গোলাম আযমকে অভিযুক্ত করেছেন যে গোলাম আযম শেখ মুজিবের জায়গা দখল করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে মওলানা কাওসার নিয়াজী গোলাম আযম ও জামাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন আল-বদর গঠন করে বামপন্থীদের নির্মূলের। জবাবে, ১২ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বিবৃতি পাঠ করে গোলাম বলে, “Unable to refute the accusation that leftists were – supporting the secessionist movement in East Pakistan, Moulana Kausar Niazi has brought charges against Gholam Azam and the Al-Badr.”

গোলাম আযমঃ …আর্মির সঙ্গে সহযোগিতা করার সুযোগ কি, সহযোগীর কোন, আর্মির কাজ হচ্ছে আর্মস দিয়ে কাজ করার, আমরা কি সহযোগিতা করবো। তারপরে, তাদের বিরোধিতা করা, বিরুদ্ধে কোন কথা বললেও পত্রিকায় তো আসে না।…

আগের দুটো পর্ব পড়া থাকলে এই কথার পর পাঠক অট্টহাসি দিলে অবাক হবো না। সবধরণের সহযোগিতা দিয়ে শান্তি কমিটির মতো সংগঠনের যাত্রা শুরু যার মাধ্যমে, রাজাকার-আল বদরের মূলশক্তির উৎস যে রাজনৈতিক দল- তার প্রধানের মুখে এমন ডাহা মিথ্যে শুনলে একজন ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীকে চাক্ষুস দেখার পুলক মিলে বটে, তবে সেটা সুখানুভূতি নয়। বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া ২১ জুন তার সুপারিশটা একটু পড়ে দেখুন:

গোলাম আযমঃ …এই ২৫শে মার্চের ২ দিন পরে বোধহয় কেরানীগঞ্জেও এরকম হত্যা করা হলো। না, আরো কয়দিন পরে। মানে, টিক্কা খানের সঙ্গে আমার দেখা করার পরের দিনই আমি শুনলাম যে আমাদের লোকও মারা পরছে এই কেরানীগঞ্জে। আমি টেলিফোন করে টিক্কা খানকে বললাম, আপনি বলছেন যে আর এ রকম হবে না, এই যে এই কেরানীগঞ্জে হলো? বললো যে, আমাদের কাছে কমপ্লেইন এসেছে যে, ঢাকা থেকে পালাইয়া এরা, যারা আমাদের বিদ্রোহী, তারা কেরানীগঞ্জে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, সে জন্য আমরা এটা করেছি। আমি বললাম, আবার তো করলেন, কিন্তু মরলো তো সাধারণ লোক, যাদের বিরুদ্ধে আপনাদের অভিযোগ তারা তো সেখান থেকে পালাইয়া গেছে, চলে গেছে ইন্ডিয়া, এ সাধারণ লোক মরলো। তো, এইভাবে যতটা সম্ভব প্রতিকার করার চেষ্টা হয়েছে।…

কেরানীগঞ্জের গণহত্যার ঘটনা নিয়ে সিদ্দিক সালিক ভিন্ন কথা বলেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূলের কাজেও যে ব্যবহার করতো তার একটা উদাহরণ সালিক দিয়েছেন কেরানিগঞ্জের ঘটনায়:

…Some of them were genuinely interested in the integrity of Pakistan and they risked their own lives to cooperate with the Army, but a few of them also used their links with the Army to settle old score with pro-AL people. For instance, a rightist politician arrived one day in Martial law headquarters with a teen aged boy. He met me by chance on the Veranda and whispered in confidence that he had some vital information to impart about the rebels. I took him to the appropriate authority where he said that the boy, a nephew of his, had managed to escape from a rebels’ concentration in Keraniganj across the Burhi Ganga River. The boy added that the rebels not only harassed the locals but also planned to attack Dacca city at night.
A ‘cleaning operation was’ immediately ordered. The commander of troops was briefed. The field guns, mortars and recoilless rifles were readied to ‘soften’ the target in a pre-dawn bombardment. The troops were to make a pincer move to capture it at day-break. I watched the progress of the action in the operations room where the gunfire was clearly audible. Soon some automatic weapons also joined the battle. Many people feared that the attacking battalion might not be able to bag all the 5,000 rebels reported in the locality. The operation was over after sunrise. It was confirmed that the target had been neutralised without any casualties to our troops.In the evening I met the officer who carried out the attack. What he said was enough to chill my blood. He confided. ‘There were no rebels, and no weapons. Only poor country-folk, mostly women and old men got roasted in the barrage of fire. It is a pity that the operation was launched without proper intelligence. I will carry this burden on my conscience for the rest of my life’…(Witness to Surrender: page 94-95)

ভাবানুবাদ এরকম: (ডানপন্থী ইসলামীদলগুলোর) অনেকেই অখন্ড পাকিস্তানের ব্যাপারে আন্তরিক থাকলেও এদের অনেকে আবার সেনাবাহিনী ষঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে আওয়ামীপন্থীদের নির্মূলে কাজে লাগিয়েছে। যেমন একদিন এক ডানপন্থী নেতা এক কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক প্রশাসকের দপ্তরে এলেন। বারান্দায় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেলো, আমাকে চুপিসারে বললো বিদ্রোহীদের (স্বাধীনতাপন্থী) ব্যাপারে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। আমি তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর সে জানালো সম্পর্কে তার ভাগ্নে/ভাতিজা কিশোরটি বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ থেকে পালিয়ে এসেছে, সেখানে বিদ্রোহীদের বিশাল একটি দল অবস্থান করছে।
সঙ্গে সঙ্গে ‘নির্মূল অভিযান’-এর আদেশ এলো। সেনাদের অধিনায়ককে ব্রিফ করা হলো। ভোরের আগেই গোলন্দাজ আক্রমণে এলাকাটা নিয়ন্ত্রণে আনার সুবিধার্থে ফিল্ডগান, মর্টার এবং রিকয়েলেস রাইফেল ব্যবহার করা হলো। দিনের শুরুতেই সেনারা জায়গাটা দখলে নিতে ইচ্ছুক। আমি অপারেশন রুমে থেকে অভিযানের অগ্রগতি দেখলাম, গোলার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো সেখান থেকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে যুক্ত হলো স্ব্য়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজ। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন আক্রমণকারী ব্যাটেলেয়নটির পক্ষে হয়তো ৫ হাজার বিদ্রোহীদের সবাইকে আয়ত্বে আনা সম্ভব হবে না। ভোরের পরপরই অভিযান শেষ হয়ে গেলো। নিশ্চিত করা হলো আমাদের পক্ষে কোনো হতাহত ছাড়াই জায়গাটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সন্ধ্যায় অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া অফিসারের সঙ্গে দেখা করলাম। সে যা বললো শুনে রক্ত হীম হলে এলো আমার। সে চুপিসারে জানালো, ‘ওখানে কোনো বিদ্রোহী ছিলো না। বিরামহীন গুলির শিকার সব এলাকার গরীব লোকজন, বেশীরভাগই নারী এবং বৃদ্ধ যারা ওই আগুনের কুন্ডলীতে সেদ্ধ হয়েছে। দুঃখজনকভাবে ভালোমতো খোজ না নিয়েই অভিযানের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সারাজীবন আমার বিবেকের কাছে এজন্য দায়বদ্ধ থাকবো আমি।’

মিথ্যে তথ্য দিয়ে এমন গণহত্যার ঘটনা অসংখ্য ঘটেছে গোটা একাত্তর জুড়ে। সেই গণহত্যার ধরণটা কেমন তার একটি ফুটেজ দিয়ে আবারও আমাদের ঝিমিয়ে পড়া বিবেককে জাগিয়ে তুলি:

গোলাম আযমঃ …পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ই আগস্ট। ১৪ই আগস্টে কার্জন হলে নূরুল আমীন সাহেবের নেতৃত্বে, সভাপতিত্বে জনসভা হলো। সে জনসভায় আমার আগে দু’একটা বক্তৃতা হয়েছে, আমার বক্তৃতা থেকে আমি এই অভিযোগ বললাম যে, এ আর্মি যে সমস্ত কাজ করছে এ কাজের দ্বারা জনগণ পাকিস্তান বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। তারা পাকিস্তান এক রাখার জন্য কাজ করছে বলে দাবী করে, অথচ পাকিস্তান ভাংছে তাদের কাজে। পাকিস্তান টিকবার কোন আমি সম্ভাবনা দেখি না। আমার বক্তৃতার পরে যারা বক্তৃতা করেছেন তাদের এই লাইনেই বক্তৃতা করতে হয়েছে।…

‘সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে উদ্ধার করার বিকল্প ছিলো না’- দুদিন পরপর বিভিন্ন বক্তৃতায় এ বয়ান দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলা গোলামের আরেকটি মিথ্যাচার এটি। জনসভা নয়, শান্তি কমিটি আয়োজিত একটি সিম্পোজিয়াম ছিলো এটি। সেখানে প্রত্যেকের বক্তৃতার রেকর্ড আছে। গোলাম সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছে আর সবাই তাকে অনুসরণ করেছে কথাটা সত্যি নয়। বরং সে সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করেছে শান্তি কমিটির উপর আস্থা রাখতে, দেশের জনগণকে বোঝানোর ভারটা তাদের ওপরই ছেড়ে দিতে। গোলাম অবশ্য আত্মজীবনিতে বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়েই লিখেছে তার সেদিনের বক্তৃতার কথা। টিভিতে বলেছে তার আগে দুয়েকজন বক্তৃতা দিয়েছে, কিন্তু জীবনিতে লিখেছে তার আগের দুজন তখনো আসেনি বলে তাকেই প্রথম বক্তৃতা দিতে হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

আসল কাহিনী সে সময় শান্তি কমিটির সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। জেলা ও মহকুমা প্রশাসক থেকে শুরু করে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও সেনা পদলেহনের সুবাদে শান্তি কমিটি নেতাদের খবরদারিতে অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। একইসঙ্গে বিহারী ও অবাঙ্গালীদের নিয়ে গড়া ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেসের (ইপিসিএএফ) কাছেও রাজাকারদের হেনস্থা হতে হচ্ছিলো প্রায়ই। তারা রাজাকারদের নিয়ে কোনো যৌথ অভিযানে যেতে চাইতো না, অথচ পত্রিকাগুলোয় ফলাও করে ছাপা হতো এদেরই সাফল্যের কীর্তি।

শান্তি কমিটির কার্যক্রমে কোনো বিধি আরোপ হলে কিংবা তাদের ক্ষমতা খর্ব করা হলে জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিপর্যয় ঘটে যেতো। এ কারণে একই দিন দৈনিক সংগ্রামে দুটো উপসম্পাদকীয় ছাপা হয় একটিতে শান্তি কমিটির কিছু বাড়াবাড়ির সমালোচনা করে, এবং অন্যটিতে এর অপরিহার্যতা বর্ণনা করে। ‘শান্তি কমিটির কর্তব্য ও গুরুত্ব’ শিরোনামে লেখা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির বয়স আজ সাড়ে চার মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তবে শান্তি কমিটির অপ্রশংসনীয় কাজ যে আদৌ নেই তাও বলা চলে না। কারণ দেশের মানুষ দিয়েই শান্তি কমিটি গঠিত। আকাশের ফেরেশতাদের দ্বারা নয়। তাই দেশের মানুষও যেমন ভুলত্রুটি মুক্ত নয়, তেমনি মুক্ত নয় তাদের নিয়ে গড়া শান্তি কমিটি। এ কারণেই কোথাও বা শান্তি কমিটি নাকি অশান্তি কমিটিরই নামান্তর হয়ে দাড়িয়েছে।’ শান্তি কমিটির ভাবমূর্তি ফেরাতেই জামাতের অপরিহার্যতার ইঙ্গিত দিয়ে ‘শুধু সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে না’ শিরোনামে বলা হয়,

‘ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তানের নেতা উপনেতা খতম হলে জনতাও হতাশ পড়বে। তখন শুধু সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে না। এ কারণেই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে নিখুঁত ও এককেন্দ্রিক শান্তি কমিটি ও তার অধীনে নির্ভেজাল ও প্রয়োজনীয় রেজাকার বাহিনী। এ দুটো সংগঠন যদি সুষ্টভাবে চালু হয়ে যায় তাহলে সেনাবাহিনী যেমন বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় পূর্ণ আত্মনিয়োগ করতে পারবে, তেমনি শান্তি কমিটি ও রেজাকার বাহিনী পঞ্চম বাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারতীয় গেরিলাদের বিরুদ্ধে পাল্টা গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারেও গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।’

মূলত গোলাম আযম ও তার সঙ্গীদের শান্তি কমিটির কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন রাখার ওই দাবিনামা মানতে বাধ্য হয় সামরিক আইন প্রশাসন এবং এই মর্মে নির্দেশ জারি করা হয় যে বেসামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তারা (ডিসি, মহকুমা অফিসার, টিএনও ইত্যাদি) শান্তি কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাতে সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রশাসনের অনুমোদন নেবে। মুখে বললেই হবে না, স্বপক্ষে প্রমাণও দাখিল করতে হবে। তাই এর একটা নমুনা নীচে দেওয়া গেলো। ৩০ আগস্ট এই চিঠিটি পাঠানো হয় যশোর সহকারী সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তর থেকে, যাতে সইকরেছে মেজর মোহাম্মদ আমিন। রাজাকারদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে তার নিশ্চয়তা চেয়ে পাঠানো প্রশাসনিক চিঠিটির অনুলিপি যশোরের ডিসির পাশাপাশি যশোর জেলার শান্তি কমিটি সভাপতির কাছেও দেওয়া হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে আরো তথ্য চেয়ে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে তা ফরোয়ার্ড করা হয়েছে যশোর শহর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে।

রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিবেদিতপ্রাণ অনুচর শান্তি কমিটির মর্যাদা যে বেসামরিক প্রশাসনের বরাবর ছিলো তার আরেকটি প্রমাণ ওই যশোরের ডেপুটি কমিশনার অফিস থেকে পাঠানো একটি নির্দেশনা যাতে সই করেছেন সহকারী ডেপুটি কমিশনার তাজুল ইসলাম। যশোর সদর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইলের সাব ডিভিশনার অফিসারদের (এসডিও) পাঠানো ওই সরকারী চিঠিতে নিহত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের রিলিফের আটা বিলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য এলাকাপ্রতি বরাদ্দ আটার পরিমান (মন হিসেবে) উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারী চিঠিটির নীচেই এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে যশোর সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তরে যেখানে পুরা সিদ্ধান্তটি তাজুল ইসলামের চেম্বারে শান্তি কমিটির জেলা সভাপতির উপস্থিতিতে সামরিক আইন প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে লেখা হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর সমালোচনা দূরে থাক, পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি ফেরাতে বেসামরিক প্রশাসন চালু ও সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার রাজনৈতিক দাবিটির কড়া সমালোচনা করে উদ্বেগ জানায় সংগ্রাম ১ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে।

গোলাম আযমঃ …কিন্তু এসব তো কোনটাই পত্রিকায় আসে নাই। তখন তো পত্রিকা সেন্সরড হতো।
সাংবাদিকঃ তখন তো আপনাদের পত্রিকা ছিল, সংগ্রাম।

গোলাম আযমঃ পত্রিকা তো সেন্সরড হতো। পত্রিকার তো ক্ষমতা ছিল না যে স্বাধীন ভাবে ছাপায়। সেন্সর করে যা দিত তাই ছাপতে পারতো। বায়তুল মোকাররমে মিটিং করে আমি তাদের বিরুদ্ধে এই সমস্ত অভিযোগ করেছি, কোনটাই পত্রিকায় আসে নাই।

সাংবাদিকঃ আপনি কি এটা বলতে চাচ্ছেন যে ঐ সময়ের পত্রিকায় যা ছাপা হয়েছে আপনাদের নামে সেগুলি সব ভুল ছিল বা পাকিস্তানের চাপে পড়ে পত্রিকা ভুল সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল?

গোলাম আযমঃ ভুল সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল কিনা আমি বলতে পারি না, আমি বলতে পারি আমার বক্তব্য আসতে দেয় নাই পত্রিকায়। তাদের বিরুদ্ধে যেগুলি যায় সেগুলি কোন কথা আসতে দেয় নাই।

সাংবাদিকঃ এটা কি একদম সংগ্রামসহ সব পত্রিকায়?

গোলাম আযমঃ সব পত্রিকায়।

মিনিমাম হোমটাস্ক না করা বোকা সাংবাদিককে (এখন মনে হচ্ছে তাকে আসলে নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র সাপ্লাই করা হয়েছে জামাতের তরফে) এটা গোলামের ধূর্ত জবাব। এটা সত্যি যে সে সময় পত্রিকাগুলো সেন্সরশিপের আওতায় ছিলো। কিন্তু গোলাম তার জীবনি কিংবা টিভিতে নিজের যে সাধু ভাবমূর্তি দেখানোর প্রয়াস নিয়েছে একাত্তরে সে অবস্থানে সে কিংবা জামাতে ইসলামী ছিলো না। প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক, প্রচণ্ড হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ন মানসিকতা নিয়ে তারা এবং তাদের মুখপত্র সংগ্রাম সেনাবাহিনীর তাবেদারি করে গেছে স্রেফ স্বার্থহাসিলের লক্ষ্যে। তারা কস্মিনকালেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করে নিজেদের বিপন্ন করার ঝুঁকিতে যায়নি। আর সংগ্রামে তাদের অজস্র অসংখ্য স্বাধীনতাবিরোধী কার্যক্রম, বক্তৃতা, বয়ান ও উস্কানীকে যদি কোনো সাংবাদিক পত্রিকার ‘ইচ্ছাকৃত ভুল সংবাদ’ বলে মুখে উত্তর তুলে দিতে চায় যুদ্ধাপরাধের অকাট্য সব প্রমাণের বিপরীতে, তার মেধা নিয়ে আসলেই প্রশ্ন জাগে।

গোলাম সে সূত্রেই বলতে পেরেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সে যেসব সমালোচনা করেছে সেগুলো পত্রিকায় আসেনি, সম্ভাবনা হিসেবে সাংবাদিকের কনফিউশনে বাতাস জুগিয়েছে ইচ্ছেকৃতভাবে তাদের মুখে কথা বসিয়ে দেওয়ার। এটা সত্যি সে সময় পত্রিকাতে সেন্সরশিপ ছিলো, সেনাকার্যক্রম কিংবা পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে যায় এমন কিছুর প্রকাশ ছিলো নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য। এবং যদি ধরেও নিই এই সেন্সরশিপের কারণে গোলামের যাবতীয় বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং দৈনিক সংগ্রাম প্রতিদিন আসলে সেনাসদর থেকে পেস্টিং হয়ে প্রকাশিত হতো, তারপরও কথা থাকে।’৭১ এর ২ সেপ্টেম্বর পত্রিকা থেকে সেন্সরশিপ তুলে নেয় পাকিস্তান সরকার। এই ২ তারিখের পর থেকে গোলাম যেসব বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছে, উস্কানিমূলক নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলোর দায় কি সে নেবে? জামাতে ইসলামী নেবে? ইসলামী ছাত্র সংঘের শীর্ষ নেতৃত্ব নেবে? সংগ্রাম নেবে? নিতে বাধ্য তারা। সেনাবাহিনীর তাবেদারি, মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাপন্থীদের হত্যা এবং বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের যাবতীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য বিবৃতি ওই সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার পরেও দেওয়া হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর এক বক্তৃতার (২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত) বক্তব্য নীচে দেওয়া হলো যেখানে পাকিস্তান রক্ষায় জামাত কি কি করেছে তার উল্লেখ রয়েছে:

আগেই বলা হয়েছে সেন্সরশীপ চলাকালে অন্য পত্রিকাগুলোয় যখন পাকিস্তানী বার্তাসংস্থা এপিপির খবর দিয়ে পাতা সাজিয়েছে তখন জামাতের মুখপত্র সংগ্রামকে সে পথে হাটতে হয়নি। তারা শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার প্রয়াস পেয়েছে, বাকিরা যখন কোনোমতে টিকে থাকার লড়াইয়ে, সংগ্রাম তখন সার্কুলেশনে দেশের এক নম্বর পত্রিকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নমুনা মেলে ৪ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে। ‘সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা ছিলো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর’ শিরোনামে পাকিস্তান সরকারের এই প্রেস সেন্সরশীপ আরোপের জন্য প্রতিপক্ষ সংবাদপত্রগুলোকে দায়ী করে রীতিমতো তুলোধুনো করা হয়। ইত্তেফাক, পূর্বদেশ, আজাদ, মর্নিংনিউজসহ যেসব পত্রিকা শুরু থেকে মুজিবের স্বাধীকার আন্দোলনকে সমর্থন এবং মার্চের শুরু থেকে অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষ নিয়েছিলো তাদের অভিযুক্ত করে সংগ্রাম যা লেখে তা নিচের ছবিতে তুলে দেওয়া হলো। বলা বাহুল্য এসব পত্রিকার সেসব অকুতোভয় সাংবাদিককে জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে ডিসেম্বরে, স্বাধীনতার প্রাকপ্রহরে।

বায়তুল মোকাররমে জনসভা খুব বেশী করেনি গোলাম আযম। একাত্তরে এপ্রিলের ওই শান্তিকমিটির শোভাযাত্রার পর ১৬ অক্টোবর একটি জনসভা করেছে সে জামাতে ইসলামীর। সেখানে বরং জামাত শান্তিকমিটির হয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে দাবি করে সে বলে :”The Jamaat, in its atlempt to bring back normal conditions in the entire country, has been working tirelessly with the Peace Committee.” এর প্রেক্ষিতটাও জানা প্রয়োজন। তখন ডক্টর মালেককে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অধীনে এক মন্ত্রীসভাও গঠন করা হয়েছে যাতে ছিলো জামাতের দুজন- আব্বাস আলী খান ও সোলায়মান। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে কিছু অংশে নতুন করে নির্বাচন হবে ঘোষণা দিয়ে সত্যি সত্যি ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে ইয়াহিয়া। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়া হবে এমনই এক জল্পনায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতেই ওই জনসভা আয়োজন করে জামাত। সেখানে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টিকে আঞ্চলিক দল সম্বোধন করে এর দুই নেতা শেখ মুজিব ও ভুট্টোকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে গোলাম জামাত ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানোর প্রয়াস পায়। সমালোচনা থেকে বাদ যায় না ন্যাপের দুই প্রধান ভাসানী এবং অধ্যাপক মোজাফফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান, দালাল রাজনীতিবিদ শাহ আজিজুর রহমানও (গোলামের নাগরিকত্ব ঝুলিয়ে দিয়েছিলো শাহ আজিজ এই একটা কারণেই)। আর তারই প্রেক্ষিতে গোলাম বলে: ‘দেশে একমাত্র বেসামরিক সরকারই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে। জামায়াতে ইসলামী গোটা দেশে বেসামরিক সরকার কায়েমের পথকে সুগম করার জন্যই শান্তি কমিটির মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে…।’ তখন পত্রিকায় সেন্সরশীপ ছিলো না। সে যা বলেছে, তাই ছাপা হয়েছে। 

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নিখিল পাকিস্তান জমিয়াতে উলেমায়ে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মওলানা আবদুল হাকিমের বক্তৃতা। ৯ সেপ্টেম্বর মর্নিং নিউজে এটি প্রকাশ হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী এই প্রদেশের প্রতি গত ২৪ বছরের বঞ্চনার কারণে ঘটেছে। গোলামের হিসেবে এখানে সামরিক শাসনের সমালোচনামূলক কথাবার্তা যথেষ্টই ছিলো। পাশাপাশি হাকিম দাবি তুলেছিলেন যাতে শান্তি কমিটিতে সব দলের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়:

E. Pak crisis Result of Injustices

The publicity secretary of the All Pakistan Jamiat-e-Ulama-e-Islam, Maulana Abdul Hakim, said in Dacca yesterday that the present situation in East Pakistan was the result of the injustice done to this province during the last 24 years, reports APP.

Addressing a press conference at Ahsan Manzil, Dacca yesterday morning, Maulana Hakim maintained that the country would not have faced such a crisis, had the majority province been allowed to enjoy its due share in all spheres of national life.

He expressed the hope that the future constitution of the country to be produced by the president should invariably incorporate the Islamic country principles of Justice so that no province could be deprived of its due share in future.

The Jamiat Publicity secretary felt that the first and foremost duty should be to restore confidence of the people of this providence. He appealed to all the political parties not to exploit the crisis in their own benefits or interests,

He also observed that in view of Indian threat the people in general, and the Razakars, in particular, should be given full military training (Fouji training). So that they could face the enemies till the arrival of armed forces in their aid.

Regarding the publicity and information media of the country, he emphasised the need for having more powerful transmission of Radio Pakistan, so that its programmes could be heard from foreign countries. “We must have to reply to the All India Radio; and BBC through our transmitting centres,” he added.

He was also in favour of introducing Arabic programme so that the Arab countries might not misunderstand us in the circumstances. This was what the All India Radio and BBC were doing to mislead the Arabs about the situation in Pakistan, he continued.

He also suggested that the peace committee must be represented by members of all the political parties.

সাংবাদিকঃ গেল যে নির্বাচন, সে নির্বাচনের পর থেকেই তারা যখন জানতে পেরেছে যে ইসলামিক বিশেষ করে জামায়াত যদি বিএনপির সাথে এক হয় সেক্ষেত্রে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না, সেহেতু তারা যুদ্ধাপরাধের এই বিষয়টা তারা সামনে এনেছে। এই সামগ্রিক যে প্রক্রিয়া, এই প্রক্রিয়াটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? এখন যে চলমান প্রক্রিয়াটা।

গোলাম আযমঃ মানে প্রক্রিয়া হইলো যে আ’লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র, আ’লীগ যাতে ক্ষমতায় যেগে পারে সেজন্য এটা একটা ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগের বিকল্প যে দলটা তারা যাতে বিজয়ী হতে না পারে সেজন্য এটা ষড়যন্ত্র। যে উদ্দেশ্যে তারা কেয়ারটেকার সিস্টেম গুটাইয়া দিল, সে উদ্দেশ্যেই তারা এগুলি সব করছে।

এই অংশটা তার যুদ্ধাপরাধ ঢাকার সাফাই মাত্র। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামী লীগের দাবি না, এটা কোনো রাজনৈতিক দাবি না। এটা জনগনের দাবি, শহীদ, বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনদের দাবি। ‘৭৫এ জাতির জনক হত্যার পর সব আইন বিলুপ্ত করে আবারও অধিষ্ঠিত এসব ঘাতক দালালের বিচার করতে হলে উপায় ’৭৩ এর ওই বিশেষ আইনটি। আর তা বাস্তবায়িত করতে চাই মুক্তিযুদ্ধমনস্ক এবং বিচারের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো সরকার যারা বাদি হয়ে মামলা করবে এদের বিরুদ্ধে। গত নির্বাচনে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। সেটা বাস্তবায়ন করছে তারা জনগনের চাপেই। নিজের সাফাইয়ে গোলামের এজাতীয় মিথ্যাচার নতুন কিছু নয়,স্বাধীনতা বিরোধীতায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া দলটির নেতা গোলামের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া দলটির প্রতি বিদ্বেষ বেশ প্রাচীন, যার বর্ননা ছত্রে ছত্রে মেলে তার আত্মজীবনিতে। বরং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ যে আসলে একটি হিন্দুয়ানি কনসেপ্ট এবং এটি মানা মানে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া, ভারতের দাসত্ব বরণ করা- এমন উদ্ভট তত্ব একমাত্র গোলামের মতো ফ্যানাটিকের মাথা থেকেই আসতে পারে।

আওয়ামী লীগকে ছোট করতে এবং নিজের যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দিতে ইতিহাস বিকৃতি ও ফ্যাক্ট টুইস্টিংয়ের চরম উদাহরণ দিয়েছে সে, যেমন ৭ মার্চ মুজিবের জয় পাকিস্তান বলা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জয়গান এবং স্বাধীনতা মানে আসলে ভারতের কাছে পাকিস্তানের পরাজয়- প্রতিটি বাক্যে এই একটাই বার্তা, বাংলাদেশ হিন্দু ভারতের গোলাম, আর জামাত এটা ঠেকাতে এবং এ থেকে মুক্তি দিতে লড়ে আসছে একাত্তর থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ কেনো জামাতকে শত্রু মেনেছে তার একটা হাস্যকর কারণ দিয়েছে গোলাম আত্মজীবনীতে। ৯ এপ্রিল রেডিওতে একটা ভাষণ দিয়েছিলো সে। তার ভাষায়, ‘এতে নির্বাচন, আওয়ামী লীগ, স্বাধীনতা আন্দোলন, সামরিক অভিযান ইত্যাদির কোনো উল্লেখ না করে ভারতে মুসলমানদের দুর্দশার বিবরণ দিয়ে ভারত যে মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না তা প্রমাণ করলাম।…আমার রেডিও ভাষণে সামরিক সরকার সন্তুষ্ট না হলেও আওয়ামী লীগ মহলের বুঝতে বিলম্ব হয়নি যে আমরা তাদের বিরোধী।রেডিওতে এ ভাষণ প্রচারের পর সারাদেশেই জামায়াতের সাথে জড়িত সবাই আওয়ামীদের হুমকির সম্মুখীন হয়।তার মানে সেই রাজনৈতিক বৈরিতাই আওয়ামী লীগ এখনও চালু রেখেছে!

(চলবে)

 

সংক্ষিপ্ত লিংক http://combostruct.com/4ET6