ডাক্তার ডেভিসের ডায়েরি : দ্য চেঞ্জিঙ ফেস অব জেনোসাইড

আমার কথা: আর্কাইভ খুড়ে এই লেখাটা তুলে আনার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কথা মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার প্রথমদিকের কাজগুলো নতুন নতুন লেখার ভিড়ে আড়ালে চলে গেছে। যখন এসব লেখা তখন ব্লগার বলতে জনাপঞ্চাশেক, পাঠকও। তারপর এই দীর্ঘ ছয়বছরে এসব প্রসঙ্গে আরো লেখালেখি হয়েছে, সেখানে হয়তো সম্পূরক লিংক হিসেবে যোগ করেছি, সেগুলো কেউ ক্লিক করেছেন, কেউবা এড়িয়ে গেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন মনোবিদের একটা সাক্ষাতকার নিয়ে কাজ করছিলাম, যিনি বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা দিয়েছেন। সেই লেখাটা ব্লগে দেওয়ার আগে সেই সময়কালটা বুঝতেও এই লেখাগুলোর গুরুত্ব আছে। এগুলো মূলত বিশাল একটা সিরিজের অংশ হিসেবে ছিলো, এখানে একত্রিত করে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত বীরাঙ্গনাদের অনেকে যে যুদ্ধশিশুদের জন্ম দিয়েছেন, তাদের নিয়ে কিছু কল্পকথার প্রসব চোখে পড়েছে। সেই শিশুদের জন্য মায়েদের হাহাকার, তাদের যদি আবার দেখা হয় এনিয়ে মেহেরজান টাইপের সংলাপ। এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে এসব অত্যন্ত নির্দয় কল্পনা। একজন সন্তান আসে বাবা-মায়ের ভালোবাসার ফসল হয়ে, তার ভ্রূণ অবস্থা থেকে ভুমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত মমতার স্পর্শ দেয় মা নিউরনে নিউরনে। কিন্তু যুদ্ধশিশু? এদের জন্ম দেওয়া মায়েরা কি সেই ভালোবাসা ধারণ করেছেন? আধো নেংটা হয়ে ট্রেঞ্চে পড়ে থাকা এই মায়েরা কি দিন গুনেছেন সন্তান জন্মের নাকি নরক থেকে উদ্ধারের? তাদের তো মাথার চুলটাও কেটে ফেলা হতো যাতে ঝুলে আত্মহত্যা করতে না পারে। এইরকম একটা শিশু ধরা যাক বড় হয়ে তার মায়ের সামনে এলো বললো মা আমি খুজে বের করেছি তোমাকে। তারপর সেই মায়ের স্মৃতিতে কোন ছবিটা আসবে? নিষ্ঠুর লালসায় তার শরীরটা খুবলে খাওয়া কিছু হায়েনার নয় কি! সেই মা কি বলবে বুকে আয় বাবা, কত খুজেছি তোকে, কত ভেবেছি তোকে? যদিও জানি না আমাকে দিনের পর দিন নির্মম লালসায় ধর্ষণ করা ৪০-৫০ জন হারামজাদার ঠিক কোনজন তোর বাবা।

ডক্টর জিওফ্রে ডেভিস এই বীরাঙ্গনাদের নিয়েই কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পরপর এই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা ছিলো এটি। সামাজিক তো বটেই। মূল লেখাটি ডেভিসের রোজনামচা, এই দেশে তিনি যে কাজ করেছেন তার পেশাদার লগবইটি অনুবাদ করেছি আমি, তাতে ফুটে উঠেছে সেইসময়কার বাস্তবতা। ডেভিসের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন ডক্টর বীনা ডি কস্টা, সম্পূরক তথ্য হিসেবে যোগ করেছি সেটাও। এর বাইরে কিছু ভিডিও ফুটেজ। ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর ডক্টর ডেভিস মারা গেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের একজন সুহৃদ হিসেবে তাকে সম্মাননা দিয়েছেন। ডেভিসের ইচ্ছে ছিলো যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাংলাদেশকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে সাহায্য করা। যেটা সম্ভবত পেশাদারী সাক্ষ্যের মাধ্যমে। সে ইচ্ছেটে অপূর্ণই থেকে গেছে তার। শিরোনামের ছবিটার জন্য কৃতজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মাহবুব সুমনকে, ডক্টর ডেভিসের মেয়ের কাছ থেকে এই ছবিটা নিয়ে আমাকে মেইল করেছিলেন। ১৯৭২ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অবকাশের সময় একজন বাঙালী মাঠকর্মকর্তার সঙ্গে ছবিটি তুলেছিলেন ডেভিস। যার কর্তিত অংশ বিভিন্ন জায়গায় চোখে পড়ে আমাদের।

দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড : ড. জিওফ্রে ডেভিসের রোজনামচা 

[এটি ডাঃ জিওফ্রে ডেভিসের নিজের লেখা। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষিতা নারীদের গর্ভপাতে সাহায্য করতেই এ দেশে এসেছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ মাস ছয়েকের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেছেন। এতে আনুষঙ্গিক উপাত্ত হিসেবে এসেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কিছু কাভারেজের অংশ বিশেষও। এবং তার অনেকখানিই আমাদের প্রতিষ্ঠিত বা এখন পর্যন্ত জানা জ্ঞানের সঙ্গে যায় না। আমি মূলত জোর দিয়েছি ডেভিসের সে সময়কার অভিজ্ঞতার ওপর, প্রসঙ্গক্রমেই এসেছে টিওপি (টার্মিনেশন অব প্রেগনেন্সি) করতে গিয়ে কী ধরণের অদ্ভুতুরে সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাকে ও তার দলকে। মোকাবেলা করতে হয়েছে অদ্ভুত সব পরিস্থিতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ করে গাইনীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য মনে হয়েছে ডেভিসের অভিজ্ঞতা]

মূল লেখা: ddavis
দমনপীড়নে বাংলাদেশের অধিকারবোধ টিকিয়ে রাখতে বিশাল এক পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের। ইসলামাবাদের তরফে পাকিস্তানী সেনাদের ওপর ছিল তাই এক বিশেষ নির্দেশনা। বিবাহিত কিংবা কুমারী, যতবেশি সম্ভব বাঙ্গালী মেয়েকে গর্ভবতী করা! বিশেষ এই নির্দেশের একটা বিশেষত্ব ছিল যে বাঙ্গালীদের চিরকালীন অহমের জাতীয়তাবোধে একটা আঘাত হানা। শংকর এক জাত সৃষ্টির মাধ্যমে সেটাকে টলিয়ে দেওয়া। আবার একটি ধর্মীয় নির্দেশনাও, কোনো মুসলমান আর যার সঙ্গেই লড়ুক, তার বাবার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না।

বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার অসহায়ভাবে আবিষ্কার করল এত দুর্যোগের ভিড়ে নতুন আপদ । বিশাল সংখ্যক কুমারী গর্ভবতী, যাদের বেশিরভাগই কুড়ি পেরোয়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাহায্য চাওয়া হলো। একই সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে দেশব্যাপী একটি গর্ভপাত কর্মসূচী নেওয়া হলো। তখনই আবিস্কৃত হলো দেশটির আইনীব্যবস্থা মান্ধাতা আমলের। জনসংখ্যা নিয়ে হিমশিম খাওয়া দেশগুলোর একটি এই বাংলাদেশের পেনালকোডে এখনো ৩১২ ও ৩১৩ ধারা বলবৎ। ১৮৬১ সালে প্রবর্তিত ব্রিটিশ আইনের ৫৮ ও ৫৯ ধারাই এগুলো।

তারপরও হালকা বিমানে করে দেশব্যাপী প্রচারপত্র ফেলা হলো গর্ভপাতের নিয়মকানুন জানিয়ে। এটা বেশ কার্যকর প্রচারণা হয়েছিল, যার ফলে সামাজিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা গিয়েছিল অনেকখানি। অবশ্য এছাড়াও প্রথাগত সব মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়েছে।

‘৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লিগ ৯৮% ভোট নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়। সেটা মেনে নিতে পারেনি পশ্চিমা সেনা বাহিনী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো কিছু নেতা। ক্ষমতার এই টানাপোড়েনে ক্রমশই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল বাংলাদেশ। ‘৭১ সালের মার্চে ইয়াহিয়া খানকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক গোয়েন্দারা বোঝালো যে ছোটমাপের একটা সামরিক হামলা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের নিস্তব্ধ ও নিমর্ূল করে দেওয়া সম্ভব। ২৫ মার্চ রাতে ঠিক তাই করল পাকিস্তানী সেনারা, এবং হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করল তুমুল প্রতিরোধের শিকার তারা! সশস্ত্র এই প্রতিরোধ অচিরেই ছড়িয়ে গেল সারা দেশে। তাড়াহুড়ো করে গড়ে তোলা মুক্তিফৌজ (পরে মুক্তিবাহিনী) ঢাকার দক্ষিণে কুমিল্লায় পাকবাহিনীকে আক্রমণ করে বসল। ১৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় স্বাধীন পুর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো। সেখান থেকেই ব্যাপ্তি নিল পুরো মাত্রার গৃহযুদ্ধ। বাংলাদেশ বারবার বিদেশী সাহায্য চাইল। একমাত্র রাশিয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল।

মে মাসে রাজনৈতিক মিত্রতা এক অদ্ভুত রূপ নিল। মুক্তিফৌজ ভারতীয় ও বার্মিজ মাওবাদী গেরিলাদের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে লড়তে শুরু করল। এরাই যুদ্ধশেষে নকশাল ও মেসো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ গড়ে তুলল আর তখন মুক্তিবাহিনীই তাদের দমনে নামল। রাশিয়া বাংলাদেশকে সমর্থন দিচ্ছিল। আমেরিকা ছিল দ্বিধাগ্রস্থ। আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে সাহায্য করছিল এবং নিশ্চিত ছিল তারাই জিতবে। কিসিঞ্জার ইসলামাবাদকে ব্যবহার করছিলেন পিকিংয়ের সঙ্গে সমঝোতার একটা ক্ষেত্র হিসেবে। পিকিং যখন পাকিস্তানের পক্ষ নিল, ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাংলাদেশের পক্ষে। ঘটনাটা ঘটল মে মাসে, তবে রুশদের বাদ দিলে পুরো ব্যাপারটাই রইল আনঅফিশিয়াল- প্রকাশ্য নয়। ১৯৭১ ও ‘৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের হোটেলগুলোর রেজিস্টার পরীক্ষা করে বিপুল সংখ্যক রাশিয়ান উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এপ্রিলে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে ‘স্রেফ সামরিক অভিযানই পশ্চিম পাকিস্তানের একমাত্র এজেন্ডা নয়। শহরের পর শহর পাকিস্তানী সেনারা পরিকল্পিতভাবে ধংস করতে শুরু করল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক খাতগুলো যাতে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিনাশ করা যায়। ইসলামাবাদ হাইকমান্ডের (আসলে রাওয়ালপিন্ডি) নির্দেশে সৈন্যরা নিয়মমেনে গুলি করে মারতে লাগল ছাত্র, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবি এবং সম্ভাব্য নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় যে কাউকে। সেটা তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হোক বা না হোক (নিউজউইক, ২৬ এপ্রিল ‘৭১)। ‘তারা নিশ্চিত হতে চাইছিল যাতে তাদের বিরুদ্ধে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে’ (একজন মুক্তিযোদ্ধার উক্তি যিনি সিলেট ও কুমিল্লায় যুদ্ধ করেছেন)।

এরপর নাটকীয় মোড় নিল পরিস্থিতি। ২৪ মে ‘৭১ টাইমসে লেখা হলো : ‘পরিকল্পিতভাবেই সব হচ্ছে। ক্রায়ার (লুই ক্রায়ার তখনকার বিখ্যাত সাংবাদিকদের একজন) জানাচ্ছেন হত্যাকান্ড একটা নির্দিষ্ট রূপরেখা মেনে এগোচ্ছে। সরকারী বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত কোনো শহর দখলের জন্য কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে উস্কানী দিয়ে। বাঙ্গালীরা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের হত্যা করছে আর তারপর তারা সব অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।’

উদ্ধৃতিটা এ কারণেই চমকপ্রদ, যে এখানেই প্রথম আমরা বাঙ্গালীদের হাতে বাঙ্গালীদের নিহত হওয়ার খবর পাই। পরে ব্যাপারটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেয়েছি ব্যারিস্টার শামসুল হকের কাছ থেকে। উনি ত্রিশ বছরের ওপর মুসলিম লীগ করেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন তারও বেশিকাল ধরে। তার মতে পাকবাহিনী যে কোনো শহর দখল করতে গিয়ে হিন্দুদের ওপরই আক্রমন করত। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী মারত শহরের অভিজাতদের কারণ তাদের ভাষায় তারা ছিল ‘দালাল’। এই দালালের সংজ্ঞাটা ছিল এরকম, ‘যারাই পাকিস্তান সরকারের পক্ষে কাজ করছে তারা দালাল, সেটা যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধকালীনই হোক। এদের দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলতে হবে।’

যুদ্ধের পরপরই এই দালালরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। যারা বিদেশে পালাতে পারেনি এবং ধরা পড়েছে, তাদের ঢোকানো হয়েছে কারাগারে। আমি তাদের অনেককে কারাগারে পেয়েছি। নোয়াখালি জেলের কথাই বলি। সেখানের ধারণক্ষমতা ২৫০ জনের। ‘৭২ সালের ১ মে কয়েদীদের সংখ্যা ছিল ১,২৫০ জন (আমি ছিলাম ওখানে, তাদের গুনেছি, কথা বলেছি)। কেউ কেউ ঘুষ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু ১২৫০ ছিল একটা ধ্রুব সংখ্যা। তাদের অবস্থা বেশ শোচনীয়।
তথ্যটা এ কারণেও যে প্রাসঙ্গিক, যুদ্ধ পরবর্তী এই যে অবস্থা সেজন্যও তাদের দায় অনেকখানি । এই যে ব্যাপক আকারে গর্ভপাত কর্মসূচী, তার পেছনের কারণ হিসেবে এসব দালালদের ভূমিকাটাই ছিল আসল। সানডে টাইমস (২০ জুন ’৭১) লিখেছে রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি…’।

২১ জুন ’৭১ টাইম পত্রিকায় পেত্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শীর জবানীতে লেখা হয়েছে, ‘ওরা আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।’ একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যারা পারেনি, তাদের ঠাই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে।’

২ আগস্ট ১৯৭১ নিউজউইকের প্রতিবেদন, ‘আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মন্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তার মেয়েদের ধর্ষনের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার।’

১১ অক্টোবর ’৭১ নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘১১ এপ্রিল সৈন্যরা আমাদের গ্রামে এল। একদল এসে আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল কী যেন দেখাতে। ফিরে এসে দেখি আমার বোন নেই। আমার প্রতিবেশীর মেয়ে এবং এক হিন্দুর মেয়েও একইরকম নিখোজ। মে মাসের মাঝামাঝি আমার বোন আর প্রতিবেশিকে ওরা ছেড়ে দিল। কিন্তু হিন্দু মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেল না। ফিরে আসা দুজনই গর্ভবতী, বাচ্চা হবে। ওদের দিয়ে কাপড় ধোঁয়ানো হতো এরপর প্রতিদিন দু-তিনবার করে সৈন্যদের সঙ্গে শুতে হতো।’

১৫ নভেম্বর ’৭১ নিউজউইক লিখেছে, ‘সম্প্রতি পাকবাহিনী ডেমোরা গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে (এখানে মুক্তিবাহিনী কখনোই আসেনি), ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নারীকে ধর্ষন করে এবং ১২ বছরের ওপর সব পুরুষকেই গুলি করে মারে।’

’৭২ সালের জানুয়ারির শেষ নাগাদ হঠাৎ করেই বাংলাদেশ উপলব্ধি করল বড় এক দুর্যোগ অপেক্ষায়। যুদ্ধ শেষ হলেও বিশাল এক বোঝা তাদের ঘাড়ে চাপল বলে- অনাকাঙিখত মাতৃত্বের বোঝা। প্রচুর ধর্ষিতা রমনীই তখন মা হতে চলেছেন, কারো বা শেষ সময় আসন্ন। ধারণা করা হয় পুরো ব্যাপারটাই ছিল পাকবাহিনীর এক পরিকল্পিত নীলনক্সা। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ইসলামাবাদের রাজনৈতিক বা সামরিক হাইকমান্ড সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু বেশ কজন পাঞ্জাবী অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ব্যাপারটা আনঅফিশিয়ালি হলেও পরিকল্পিত (উদাহরণ, জুন মাসে ঢাকা এয়ারপোর্টে ফন শুলজকে দেওয়া এক পাক মেজরের সাক্ষাৎকার)।

সমস্যাটার চরম মাত্রার ব্যাপ্তি সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া গেল কলকাতা থেকে আসা খবরে। প্রচুর মেয়ে সেখানে গিয়েছেন গর্ভপাত ঘটাতে। সেখানকার এক ডাক্তার ঢাকা এলেন এবং এর ফলে স্থানীয়ভাবে তদন্ত করে জানা গেলো আসলেই সংখ্যাটা বিশাল। তাড়াহুড়োয় তখন একটি সংগঠন দাঁড় করানো হলো- দ্য ন্যাশনাল বোর্ড অব বাংলাদেশ উইম্যানস রিহ্যাবিলেশন প্রোগ্রাম। প্রচুর অর্থ সংস্থান করা হলো এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলো যে কোনো মূল্যে সমস্যাটা মেটাতে। সমস্যা শুধু অবাঞ্ছিত গর্ভবতীরাই নন। আরো ছিলেন বিধবা নারী যাদের অনেক সন্তান, সৈন্যদের হাতে আহত নারী (এমন নয় তারা ধর্ষিতা বা গর্ভবতী), ধর্ষিতা কিন্তু গর্ভবতী নন এবং পরিবার তাড়িয়ে দিয়েছে এমন মেয়েরা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা যারা খালাস করতে চাইছিল। ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি বিদেশী উপদেষ্টাদের সহায়তায় ঢাকায় একটি ক্লিনিক খোলা হলো। ফেব্রুয়ারির শেষনাগাদ শুরু হলো টিওপি (টার্মিনেশন অব প্রেগনেন্সি)। গর্ভপাত।

ঠিক কতজন নারী ধর্ষিতা হয়েছেন তার সংখ্যা বের করার অনেক চেষ্টাই নেওয়া হয়েছে। সরকারী হিসেবটা ছিল দুই লাখ। অংকটা এরকম : হানাদার দখলদারিত্বের সময়কালে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। থানার সংখ্যা ৪৮০টি এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছে ২৭০ দিন। ৪৮০ কে ২৭০ ও ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ জন। অন্যান্য কারণে মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছেন ধরে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড সংখ্যাটাকে রাউন্ড ফিগারে এনেছেন দুই লাখে! এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এইটাই অফিশিয়াল ধর্ষিতার সংখ্যা। এটা অবশ্যই অনেক কমিয়ে বলা। কারণ :

১. তারা আমলে নিয়েছেন শুধু নিখোঁজ রিপোর্ট পাওয়া মেয়েদের। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো চেপে গিয়েছেন তাদের মেয়েদের অবস্থান ও অবস্থা। অনেকটা লোক-লজ্জায়, সম্মানহানী ও প্রাণহানির ভয়ে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যাদের কাছে অভিযোগ করবেন তাদের কাছেই মেয়ে, অর্থাৎ রক্ষকই ভক্ষক।
সাধারণভাবে দেখতে গেলে এই বিশাল অংশটা যুদ্ধকালীন সময়টায় আটকবস্থাতেই ছিল যদ্দিন না পাকসেনাদের কাছে তারা বোঝা হয়ে পড়েছে। বোঝা বলতে শারীরিক ব্যবহারের অযোগ্য (গর্ভবতী, যৌনরোগগ্রস্থ, কিংবা দুটোই)। এরপর মেয়ে যদি মুসলমান হয় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, হিন্দু হলে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক মুসলমান মেয়েকেও হত্যা করা হয়েছে, অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ও আত্মহত্যাকারীদের সঠিক সংখ্যাটা আন্দাজে বলাটা কঠিন। যুদ্ধ শেষে আত্মহত্যার যে সরকারী হিসেব পাওয়া গেছে তাতে সংখ্যাটা ২০০ (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ’৭২)। এ সংখ্যাটা সত্যি হতে পারে কারণ হত্যা তদন্ত এড়াতেই পরিবারগুলো আত্মহত্যার ঘটনা থানায় জানাতে বাধ্য ছিল।

২. সংখ্যাটায় পাকসেনাদের অস্থায়ী অবস্থানকে গোনায় নেওয়া হয়নি। মানে তারা একটা গ্রাম বা অঞ্চলে হামলা করল এবং গণহারে ধর্ষণ চালাল। পুরোপুরি ধংস হয়নি কিন্তু আক্রমণের শিকার এরকম গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশের তিনভাগের এক ভাগ। সুবাদেই ধর্ষণের সংখ্যাও ছিল অগণিত, যদিও সবক্ষেত্রেই গর্ভধারণ অনিবার্য ছিল না।

৩. রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালরা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রচুর মেয়ে অপহরণ করেছিল (এ ব্যাপারে আগেও বলা হয়েছে)। অনুমান করা হয় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালী, আর তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ছিলেন নারী (চারটি শিশুর পরিবারকে গড় ধরে সংখ্যাটা বের করা হয়েছে)।

বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর। ১৯৭১ সালে বলা হয় সংখ্যাটা ছিল সাড়ে সাত কোটি (এটা নয় কোটি হওয়াও খুবই সম্ভব)। এর থেকে এক কোটি লোক বাদ দিন, যারা পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে কিংবা শহর বা নগর বা ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজে গেছে। বাকি থাকে সাড়ে ৬ কোটি। এদের মধ্যে ধরি দশ লাখ তরুণী-যুবতী, যারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম। এদের এক তৃতীয়াংশ যদি ধর্ষিতা হন তাতেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৩ লাখ। ৩% বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই দেশে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এদের অর্ধেক গর্ভধারণ করেছেন। ধর্ষনের কারণের এদের একজনও যদি গর্ভধারণ না করে (যেটা অবাস্তব), তারপরও দেড় লাখ নারী রয়ে যান যারা গর্ভবতী।

এদের সঙ্গে (১) নং বর্ণনার মেয়েদের ২ লাখ যোগ করুন (এখানে নিশ্চিত থাকতে পারেন তাদের সবাই গর্ভবতী এবং তাদের ঘরছাড়া হওয়ার পেছনে এটাই ছিল প্রধান কারণ)। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, মেয়েদের সংখ্যা প্রতিদিন বদলাতো এবং গর্ভবতীরাই ছিল আশ্রয়হীনা। ধরে নিতে হবে দু লাখ একটা রক্ষণশীল সংখ্যা। গর্ভবতীদের ১০ ভাগ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এভাবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখ। ঘটনার পরবর্তী প্রবাহের আলোকে ব্যাপারটা চমকপ্রদ।

যেসব জেলা আমি ঘুরেছি, এদের বেশিরভাগেই দেখা গেছে অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা অনুমানের চেয়ে কম। হিসেবের মধ্যে নিতে পারেন ইতিমধ্যে প্রসব করা এবং আত্মহত্যাকারীদের। সংখ্যাটা ছিল গ্রাম পিছু ১০ জন করে! যেসব জায়গায় সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী ছিল (গোটা দেশের অর্ধেক জনপদ), সেখানে যখনই কোনো গ্রামবাসীর সঙ্গে কারো মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি অবিশ্বাস্য এক ছবি পেয়েছি।

ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ থানা পিছু ছিল দেড়হাজার করে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদই গ্রামের দাই, হাতুরে ও হোমিওপ্যাথরা মিলে এদের বেশিরভাগেরই ব্যবস্থা করে ফেলে। রয়ে যায় অল্প কজনা। থানা পিছু দেড় হাজার করে ৪৮০টি থানায় (যেহেতু প্রশাসনিক ভবন, এখানে সামরিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী হওয়াটাই স্বাভাবিক) ৩ লাখ ৬০ হাজার পোয়াতির সন্ধান পাওয়া যায়। অন্য যে কোনো পদ্ধতিতে হিসেব করলেও সংখ্যাটা এর ধারে কাছেই থাকবে।

আমার ব্যক্তিগত মতামতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের পেছনে এসব কারণই অনেকাংশেই সঠিক ছিল এবং এদের একটা বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে অনিরাপদ প্রক্রিয়াতেই গর্ভখালাস করিয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে যে পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানো হতো সেটা অবৈজ্ঞানিক হলেও যথেষ্ট কার্যকর বলেই বিবেচিত হয়েছিল। বেশীরভাগ গ্রামেই দেখা গেছে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা ও পৌনে ইঞ্চি চওড়া একটা চোখা কাঠি ব্যবহার করা হতো। এটা যোনীপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো যতক্ষণ না তা জরায়ুর দেওয়াল ছোঁয়। বেশীরভাগ এলাকাতেই কাঠির ধরণটাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, একটা হলেই হলো। বিবাহিতারা ব্যাপারটা নিজেই করত আর অবিবাহিতদের নিয়ে যাওয়া হতো স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে (এসব জায়গায় বিয়ের আগে গর্ভবতী হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে, তবে কী হারে সেটা জানা যায়নি)। কাঠিটা জায়গামতো রেখে খোঁচানো হতো যতক্ষণ না ব্যাথা উঠে জরায়ুর পেশী এটাকে ঠেলে বের করে দেয়, সুবাদেই গর্ভপাত। জানা গেছে এটি শতভাগ কার্যকর বলে স্বীকৃত পদ্ধতি, তবে একটু ধীরগতি।

ব্যাপারটা ত্বরান্বিত করতে অন্য অনেক পদ্ধতি যুক্ত হতো। স্থানীয় করবী নামের একটি গাছের মুলের রস খেয়ে বা মুলটা সরাসরি প্রবেশ করিয়ে (কবিরাজ ও আয়ুর্বেদ পদ্ধতি) গর্ভপাত ঘটানো সম্ভব। আর যাদের অ্যালোপ্যাথি ওষুধের কথা শুনেছে (এবং খানিকটা বিশ্বাসও করত) তারা ব্যবহার করেছে কাঠি ঢোকানোর পরদিন একডোজের ৯ গ্রাম ভিটামিন সি (০.৫গ্রামের ৮টি ট্যাবলেট) যাতে ৪৮ ঘন্টায় গর্ভপাত হতো। পদ্ধতিটার কার্যকারিতা সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত।

এছাড়া অনেককে কাঠি প্রবেশের পর প্রতিদিন ৪/৫টি গর্ভনিরোধ পিল খাওয়ানো হতো, ৫ থেকে ৭দিন ধরে। আর কোর্স শেষ করার দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে গর্ভপাত ঘটত। পিলের সরবরাহকারী আইপিপিএফ, সুইডিশ সরকার ও অন্যরা জেনে নিশ্চিত খুশী হবেন যে তাদের যোগানটা বৃথা যায়নি। স্থানীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো থেকে এই পিল বিনামূল্যেই পেত ব্যবহারকারীরা।

তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরের কথা, বাংলাদেশ সরকারের কাছে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের ভীতিকর ধাক্কাটা লাগার আগেই দেখা গেল সাধারণ গ্রাম্য চিকিৎসকরাই তা অনেকখানি সমাধান করে ফেলেছে। কিন্তু দুঃজনকভাবেই বলতে হচ্ছে, এর ফলে এরা বাড়তি দুটো বড় ধরণের সমস্যার জন্ম দিল।গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো গর্ভপাত পিছু ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ করতে গিয়ে আরো ফতুর হয়ে পড়ল।গ্রামের কুমারীরা স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি গাইনি সমস্যায় আক্রান্ত হলো (যার মধ্যে বাড়তি ছিল পাক সেনাদের বদৌলতে পাওয়া যৌন রোগও)।এসব কারণে গ্রামবাসীরা আরো নির্বাক হয়ে গেল, চেপে যাওয়ার প্রবণতাটা তৈরি হলো তাদের মধ্যে।

ইংল্যান্ডে আমাকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ২ লাখের মতো অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের শিকার নারীর অস্তিত্ব রয়েছে (মার্চ ১৯৭২)। এও জানানো হলো ঢাকায় একটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে তবে সেখানে বাঙ্গালী কর্মচারিরা কাজ করছে এবং অবৈধ গর্ভপাত বিষয়ক আইনটি স্থগিত করা হয়েছে এই কর্মসূচীটি সুচারুভাবে শেষ করার জন্য। আমার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলকে গর্ভধারণের মেয়াদ বেড়ে যাওয়ার পর কীভাবে সফলভাবে গর্ভপাত করানো সম্ভব (টার্মিনেশন অব অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সি)।

প্রথম কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমি অবাক হয়ে দেখলাম যেমন আশা করেছিলাম সে হারে মেয়েরা আসছে না। সাধারণ ব্যাখ্যাটা ছিল তেমন একটা প্রচারণা হয়নি আর ব্যাপারটা দারুণ অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু বোর্ড বিশ্বাস করত যে প্রচারণ যথেষ্টই হয়েছে এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে বার্তাটা ঠিকই পৌছেছে। মেয়েরা কম আসার কারণ মুসলিম পরিবারগুলোর রক্ষণশীলতা। কুমারী মা সমাজে ভীষণ এক অপমান। যৌন নির্যাতনের শিকার যে কোনো মেয়েই ছিল পরিবারের কাছে এক লজ্জাকর বোঝা। পরিবারে এদের কারো অস্তিত্ব স্বীকার করাটা সমাজের কাছে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি যা কেউ নিতে চাইছিল না।

এমনিতেই মেয়েরা বিশেষ করে মফঃস্বল বা গ্রামগুলোতে পরিবারের ওপর একটা চাপ (সম্ভবত ডেভিস যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে হয় বুঝিয়েছেন), আর ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে তাকে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। এও ধারণা করা হয়েছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সেভাবে হয়তো খবর পৌছেনি, তবে খবরটা গেলেই মেয়েদের সংখ্যা বাড়বে। বোর্ডের মধ্যে এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হলো জেলা সদরগুলোর প্রতিটিতেই একটি করে বিশেষ ক্লিনিক খোলার।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা ক্লিনিকে ৮৪টি কেস সামাল দেওয়া হলো। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৩০। কোথাও একটা গলদ ছিল, নইলে ধারণার সঙ্গে বাস্তবের এই অমিল হবে কেন! আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না আসলে কী হবে। আমি বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর রওয়ানা দিলাম যন্ত্রপাতির দুটো পূর্ণাঙ্গ সেট নিয়ে, সঙ্গে দুশো টিওপি সারার জন্য যথেষ্ট পরিমান ওষুধ।

রংপুরে গিয়ে জানলাম স্থানীয় সদর হাসপাতালে মেয়েদের ভর্তি করা হয়েছে এবং স্থানীয় গায়েনিকোলোজিস্ট তার সীমিত সামর্থ্য নিয়েও দারুণ কাজ করেছেন। তার ছিল না স্যালাইন, প্লাজমা, পিট্রোসিন সত্যি বলতে কোনো ধরণের অক্সিটোসিক এমনকি কোনো এন্টিবায়োটিকও!

দিনাজপুরে গিয়ে প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। সেখানকার সিভিল সার্জন মন্তব্য করে বসলেন টিওপি ব্যাপারটার বৈধতা নিয়ে তার যথেষ্টই সন্দেহ আছে এবং সরকারী এমন কোনো নির্দেশনা তিনি পাননি যাতে এটার অনুমতি দিতে পারেন। তার কথা সরকারী মহলে ব্যাপারটা নিয়ে যে আলাপ হয়েছে তাতে জেলাসদরগুলোয় গর্ভবতীদের খুঁজে বের করে সবাইকে গর্ভপাত করাতে রাজী করানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসকরা কেউ এতে সায় দেননি। চিফ মেডিকেল অফিসার এও জানালেন একজন ফিরিঙ্গি হিসেবে (উনি ফেরাং শব্দটা ব্যবহার করেছেন) যেখানেই যাই আমাকে এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলবে না, কারণ বাংলাদেশের সামাজিক আচারে বিদেশী অতিথিদের লজ্জা দেওয়ার রীতি নেই। তারা এও জানালো বিএমএর স্থানীয় শাখার প্রেসিডেন্ট (একজন খাটি মুসলিম) তাদেরকে গত ডিসেম্বরে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত মুসলিম আইপিপিএফ কনফারেন্সের মতামতের উদাহরণ দিয়েছেন যাতে পরিবার পরিকল্পনার খানিকটা অংশ যৌক্তিক মানা হলেও গর্ভপাতকে বলা হয়েছে নিষিদ্ধ। যেহেতু প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তারা এর ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না। পরদিন সকালে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। এমনিতে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের কমতি না দেখালেও তার মতবাদ থেকে নড়লেন না। এও জানিয়ে দিলেন তার এলাকায় তিনিই হর্তাকর্তা, যা বলবেন সেটাই হবে।
সিভিল সার্জন ও চিফ মেডিকেল অফিসার আরো একটা হতাশা জানালেন। সবাই যেখানে কিছু না কিছু পাচ্ছে (টিওপির জন্য রোগি রেফার করলে মাথাপিছু ১০টাকা দেওয়া হতো) সেখানে তারা কেন মাগনা অপারেশন করে যাবেন! এ’দুটো চমকপ্রদ প্রসঙ্গ এরপর আমি যেখানেই গিয়েছি শুনতে হয়েছে, স্রেফ ভাষা বা বলার ধরণটা বদলে গেছে।

ঢাকায় ফিরে আমি বোর্ড চেয়ারম্যানকে জানালাম বিষয়টা। উনি বললেন জেলা পর্যায়ে প্রশাসনগুলো এখন ভীষণরকম দুর্নীতিবাজ, টাকা দিলে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যাবে। ভ্যাসেকটমি নিয়ে বছরখানেক আগে এরকম কিছু ঘটনার কথা আমি আগেই শুনেছিলাম (টাকা নিয়ে অনেক সক্ষম পুরুষও নির্বীজ হয়েছেন এবং শাড়ি-লুঙ্গি আড়াইশ টাকার বিনিময়ে কুমারি মহিলাদের লাইগেশন করানোর ঘটনা বাংলাদেশে আশির দশকেও প্রচুর ঘটেছে- অঃরঃপিঃ), তাই তার কথা শুনে অবাক হলাম না। আর বিষয়টার বৈধতার প্রশ্নে নিশ্চিত করলেন যে স্বাস্থ্য সচিব একটি বিবৃতি দিয়েছেন ইতিমধ্যে। এতে বলা হয়েছে পাকিস্তানী সেনাদের কাছে ধর্ষিতা হয়ে যেসব মেয়ে গর্ভবতী হয়েছেন, তাদের গর্ভপাত ঘটানো বৈধ। উনি এও বললেন যে পেনাল কোডের ৩১২ ও ৩১৩ ধারায় মুসলমানদের নিশ্চিন্ত করার মতো একটি বাক্য রয়েছে যে ‘মায়ের জীবন বাঁচাতে গর্ভপাত করানো যাবে’। ধর্মীয় ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

ময়মনসিংহে গিয়ে একই সমস্যার মুখে পড়লাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১২০ জন ডাক্তার-কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আমি যখন একটি লেকচার দিলাম তখন ৯০ ভাগ সম্পুরক প্রশ্নই এলো গর্ভপাতের বৈধতা নিয়ে, এর টেকনিক নিয়ে নয়।

ঢাকাতে আমি সেই চিঠিটার একটা কপি জোগাড় করার চেষ্টা করলাম যাতে গর্ভপাত কর্মসূচীর অনুমতি দেওয়া হয়েছে (অবৈধ হলেও)। স্বাস্থ্য সচিব সেটা শুনেছি সব জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও চিফ মেডিকেল অফিসারের কাছে পাঠিয়েছেন। একটা অনুলিপিও পেলাম না, এমন কারো দেখাও পেলাম না যে কিনা এর কোনো কপি নিজের চোখে দেখেছে। আমি সরাসরি সচিবের সঙ্গে দেখা করলাম। শুরুতে পাঠিয়েছেন বললেও পরে স্বীকার করলেন আসলে এ ধরণের কোনো চিঠিই পাঠানো হয়নি। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রব চৌধুরিকে নিয়ে একটা বৈঠক ডাকলাম। আর সেখানেই বিষয়টা নিয়ে রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিভেদ ও দলাদলিটা আরো পরিষ্কার হয়ে গেল। উনি স্বাস্থ্য সচিবকে ফোন করলেন এবং জানলেন চিঠি নাকি পাঠানো হয়েছে (আমি আর বললাম না আমাদের আগের দিনের সাক্ষাতের সারবেত্তা)। আমরা তারপরও একরকম জোরাজুরি করেই তার কাছ থেকে একটা চিঠি আদায় করে নিলাম। বললাম হয়তো দূরদূরান্তে সচিবের চিঠিটি যায়নি। সৌভাগ্যক্রমে কথাবার্তাগুলো আমি রেকর্ড করেছিলাম। পরে বিভিন্ন জেলায় যখন চিঠিতেও কাজ হয়নি, তখন তা বাজিয়ে শোনানোর পর ফল পেয়েছি।

পরিস্থিতি দাড়ালো এরকম, ঢাকা থেকে জাতীয় বোর্ড জেলা পর্যায়ে নির্দেশ পাঠাবেন যাতে আবাসন জোগাড় করা হয়। সেগুলো ঢাকার সেবা সদনের (ক্লিনিকটির নাম) আদলে ক্লিনিকে রূপ দেওয়া হবে। স্থানীয় বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে এ বাবদ টাকা পাঠানো হবে, আর স্থানীয় বোর্ড তখন টাকা পেয়ে পাল্টা চিঠিতে জানাবেন যে তারা-
১. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাচ্ছেন না, এবং
২. চিকিৎসকের অভাব, কিংবা
৩.চিকিৎসক আছেন কিন্তু তিনি জানেন না অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে কীভাবে গর্ভপাত ঘটাতে হয়;
৪.দূরান্ত থেকে রোগী আনার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন নেই, এবং
৫.বেশীরভাগ রোগীর সঙ্গেই একজন করে আত্মীয় (যদি কুমারী হয়) বা বাচ্চাকাচ্চা (বিবাহিতা হলে) আছে। রোগী ক্লিনিকে থাকলে, তাদের কোথায় রাখা হবে?আমার কাজ ছিল কর্মসূচির অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলো তালিকাভুক্ত করা। আর পুনর্বাসন থেকে ক্লিনিকের দিকটাকে আলাদা রাখা। বোর্ডকে সন্তুষ্ট করে প্রতিটি এলাকায় আলাদা ক্লিনিক খোলা ছিল অসম্ভব। তাই আমি পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে খোলা জায়গাগুলোই ক্লিনিক হিসেবে ব্যবহার করতে তাদের রাজী করালাম।

এরপর বোর্ডের সদস্যদের হাসপাতালের নির্বাহী ও ক্লিনিকের কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলাম। এতে সব জায়গাতেই হাসপাতালগুলোয় টিওপির জন্য রোগী ভর্তি করা সম্ভব হলো। সেজন্য অবশ্য ব্যাপারটা জীবন্ত ভ্র“নকে বের না করেই করা সম্ভব- তা করে দেখাতে হলো আমাকে। এই সমঝোতার পর প্রতিটি এলাকাতেই একটা চুক্তিমতো হলো। বোর্ড প্রত্যেক এলাকায় নিজ দায়িত্বে মেয়েদের জোগাড় করে তাদের কেন্দ্রে রাখত, যখন বিছানা পাওয়া যেত হাসপাতালে ভর্তি করাত। এরপর টিওপি শেষে তাদের বিভিন্ন কাজের ট্রেনিং দিত অথবা তারা যতদিন ইচ্ছা বোর্ডের খরচে পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকত। যেসব এলাকায় ভালো হাসপাতাল নেই, তারা সবচেয়ে কাছের বড় হাসপাতালে মেয়েদের পাঠাতে শুরু করল। টিওপি শেষে নিজেদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাদের ফিরিয়ে নিতে লাগল। দেশজুড়েই বেশ সন্তোষজনকভাবেই তা চলতে লাগল আর এর কার্যকারিতা এতটাই যে এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই।

টিওপিতে যে পদ্ধতিগুলো কাজে লাগানো হতো :

কারমান সুপারকয়েলস : এতে দুটো বড় অসুবিধা। প্রসব হয়ে যেত, বিশেষ করে যখন মাল্টিপল কয়েল প্রবিষ্ট করানো হতো। প্রায় সব রোগীরই দেখা যেত শরীরে জ্বর এসেছে। আমার ধারণা কয়েলগুলো স্থানীয়ভাবে ঠিক মতো স্টেরিলাইজ করা যেত না বলেই এমনটা হতো। দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরে পাওয়া যেত না, আর এখানেও (ঢাকায়) সরবরাহ ছিল কম।
ক্যাথেটার (মল্লিকস মেথড) : এরও দুটো বড় সমস্যা ছিল। সবসময়ই ভ্রূন জীবন্ত অবস্থায় প্রসব হতো আর মারাত্মক ধীরগতি ছিল এর কার্যকারিতার। ক্যাথেটার কয়েকবার বদল করার পরও দেখা যেত পদ্ধতিটা কাজ করছে না।
১ ও ২ উভয় পদ্ধতিতেই বাড়তি সমস্যা ছিল। যেহেতু দুজায়গাতেই অবিকৃত ভ্রূন প্রত্যাশিত ছিল (সেটা জীবিত মৃত যাই হোক না কেনো), প্রসব যন্ত্রণা ছিল প্রচণ্ড এবং কিছু ক্ষেত্রে টিওপি এড়াতে হতো। এটা বিশেষ করে হতো অবিবাহিতাদের ক্ষেত্রে।
এমনিওটিক রিপ্লেসমেন্ট : ১৯৬২ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে এত বিপর্যয় ঘটত যে এটা তুলে দেওয়ার জন্য বিশেষ সুপারিশ হয়েছিল। তারপরও এটা চালু ছিল এবং মাঝে মাঝে কাজও করত।
হিস্টারেক্টামি : আমার জানা মতে দুটো রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রচুর সময় নিত এবং ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্য কাজে ব্যবহার করা হত বলে বর্জন করা হয়েছিল।
কৃত্রিম প্রসব বেদনা জাগানো এবং আম্বালিকাল কর্ড (নাড়ি) ছেদন : ঢাকা বাদে (এখানে কারমান কয়েল পদ্ধতিটাই বেশি ব্যবহৃত) গোটা দেশেই এটা ব্যবহার করা হতো সহজ ও কার্যকর বলে। তবে এতেও অনেক সমস্যা ছিল। এতে বিশেষ নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট মাত্রার দক্ষতা ছিল খুব প্রয়োজন।
মেমব্রেন রাপচার এবং অমটোসিন ইনফিউসন : সীমিত সাফল্যে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে ব্যবহৃত। ধীর গতি, অনিশ্চিত এবং জীবিত ভ্র“ন প্রসব হতো।

ধারণার চেয়ে কম সংখ্যায় টিওপি কেস আসার কারণ :

সরকারীভাবে সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অনেক আগেই স্থানীয় চিকিৎসকরা অনেক মেয়ের গর্ভপাত ঘটিয়ে ছিলেন। একজন এখনও (লেখা হয়েছিল ২ মে ‘৭২) ঢাকায় কর্মরত আছেন। উনি সেবা সদনের কাছেই থাকেন। আটশ থেকে নয়শো মেয়ের গর্ভপাত করেছেন, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা গর্ভধারণের শুরুর দিকে। যদিও একাজের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে আমি মনে করি তাকে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হোক।
এ দেশে এখনও গর্ভপাত নিয়ে বেশ ধোয়াশা রয়েছে। আর কোনো সরকারী সংস্থাই ব্যাপারটা খোলাখুলি স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাও একটা কারণ। এবং অনেক ডাক্তারই এ ব্যাপারে একরোখা (আগে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে)।
বোর্ডের সাংগঠনিক সমস্যার কারণে প্রতিটি জেলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগে ঘাটতি ছিল। স্থানীয় প্রশাসনে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য এটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। জেলা প্রশাসকরা দেখা যেত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন। যেহেতু অনুদানটা তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো, বোর্ডের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যেত বাকিটা।
৫. রাজনৈতিক কার্যক্রম ব্যাপ্তি পাচ্ছিল খুব। সুবাদেই জেলাগুলোয় চলছিল জোর বদলির হিড়িক। সিভিল সার্জনের মতো পদগুলো ছিল রাজনৈতিক নিয়োগ। এ কারণেই কেউই এক জায়গা থিতু হতে পারছিল না। চিকিৎসকরাও এর ফেরে পড়েছিলেন। সেজন্য একদিন একজন পাওয়া গেলেও পরদিন তাকে পাওয়া যাবে সে নিশ্চয়তা ছিল না।
৬. সব জায়গাতেই এমন একটা দাবি ছিল যে ডাক্তারদের অপারেশন বাবদ টাকা দিতেই হবে। এটা জাতীয় বোর্ড মানেনি। ভ্যাসেকটমি কর্মসূচীর সময় যা হয়েছিল, বোর্ড দ্বিতীয় দফা সেটা এড়াতে চেয়েছিল।
৭. জেলা সদরগুলোয় রোগী আনার জন্য যানবাহন পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। এমন নয় যে যানবাহনের অভাব ছিল। এটা আসলে কর্মসূচীতে অসহযোগিতার একটা উদাহরণ মাত্র।
৮. কিছু জেলায় প্রশাসন এমনই দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়েছিল যে ভালো কিছু করাই ছিল অসম্ভব। স্থানীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা প্রশাসকের বরাতে টাকা পাঠানো হতো। আর উনি বোর্ড গঠন করা তো দূরে থাক, কাল্পনিক সব খাতে খরচ দেখিয়ে পুরো টাকা মেরে দিতেন।
৯. অত্যাচারিতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারিবারিক অনীহা। যদিও উদাহরণ কমই এমন। জাতীয় বোর্ড এভাবে ভেবেছে কারণ গ্রামের সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের অভাব। বেশিরভাগ গ্রামেই দেখা গেছে আত্মীয়স্বজনরা মিলে একটা বড় বসত। তাই কোনো পরিবার প্রতিবেশীদের নিন্দার ভয়ে নিপীড়িতাদের কথা লুকিয়ে যাবে, ভাবনাটাই ভুল।
১০. পেশাগত আবেগে পশ্চিম ইউরোপের ডাক্তারদের চেয়ে কম যান না বাঙালীরা। বিশেষ করে গর্ভপাতের ব্যাপারে। যারা বিদেশে কখনো যাননি, বা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে আসাদের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ কম ছিল, তারা টিওপির ব্যাপারে ছিলেন একরোখা। আর ব্রিটেন থেকে পাশ এসেছেন যারা, তাদেরও দেখা গেছে গর্ভপাতে তীব্র আপত্তি। এ ব্যাপারে হার ব্রিটানিক ম্যাজেস্টিস রয়াল কলেজ অব অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়েনোকোলজির দায়টা নিঃসন্দেহে ব্যাপক। এটা শুধু এই কর্মসূচীর ক্ষেত্রেই নয়, পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারেও খুব খাটে।
১১. গর্ভধারণের তৃতীয় ধাপে টিওপিতে যে ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার হতো তাতে জীবন্ত ভ্র“ন প্রসব করতেন মেয়েরা। এটা অনেক জায়গাতেই অনুৎসাহিত করা হতো আর এ ব্যাপারে আমার পুরো সমবেদনা রয়েছে।
১২. দীর্ঘমেয়াদে মেয়েদের ক্লিনিকে রাখাটা ছিল একটা রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা, ভুল। এটা আরো খারাপ রূপ নিয়েছে মাদার তেরেসার ঘটনায়। পূর্ণ মেয়াদী তিনটা প্রসব হয়েছিল সাভারে এবং বাচ্চাগুলো তুলে দেওয়া হয়েছিল মাদার তেরেসার হাতে। এরা পরে মারা গিয়েছিল। গুজব রটেছিল এই তিনটি মেয়েকে ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তারা কী করবে দিশা না পেয়ে বাচ্চা সমর্পণ করেছিল। আর যেহেতু গর্ভপাতের কারণেই তারা মারা গেছে। এতে ক্লিনিকের ভাবমূর্তি মোটেও উজ্জল হয়নি। এটা বলে রাখা দরকার অপুষ্টি ও অন্যান্য কারণে নবজাতকদের মৃত্যুর হার বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বরাবরই বেশি। স্বাভাবিক প্রসবেই শিশুদের আকার ছিল বেশ ছোট। ৩০ সপ্তাহের ভ্র“ণের সঙ্গে পশ্চিমের ২০ সপ্তাহের ভ্রূনের মিল পাওয়া যায়। এতে অবশ্য কর্মসূচীর সুবিধাই হয়েছে। ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত ভ্র“নের আকার একইরকম, এরপর পশ্চিম থেকে একদমই আলাদা।

(এরপর বাকিটায় ডেভিস গর্ভপাতের ক্লিনিকাল প্রসিডিউর দিয়েছেন বলে তা বাদ রাখা হলো)

ডক্টর ডেভিসের সাক্ষাতকার

(প্রাক কথন : কাগজপত্র বলছে যুদ্ধপরবর্তীকালীন সময়ে বাংলাদেশে কর্মরত চিকিৎসকদের একজন ছিলেন জিওফ্রে ডেভিস। সিডনিতে তার এই সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলেন বীনা ডি’কস্টা। সাক্ষাৎকার কাল ২০০২ সাল। স্বাধীনতার ৩২ বছর পর। অনেক ঘটনাই তখন ডেভিসের স্মৃতিতে ঝাপসা।

নিউসাউথওয়েলস থেকে পাশ করা ডেভিস বাংলাদেশে ছিলেন মার্চ ’৭২ থেকে মাস ছয়েক। ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড, ইউএনএফপিএ এবং হু’র তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন। তার কাজের ধরণের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করেই এসব সংগঠনের কেউ তাকে নিজেদের একজন বলে স্বীকৃতি দেয়নি। উনি স্মরণ করেছেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের পাশবিকতা থেকে বেচে যাওয়া মেয়েদের জন্য কিছু করতেই আমি ছিলাম সেখানে। যাদেরকে সম্ভব গর্ভপাত করানো হয়েছে, যাদের সম্ভব হয়নি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায়, তাদের প্রসবে সাহায্য করা হয়েছে। সেটা সাফল্যের সঙ্গেই আমরা করেছি। বাংলাদেশে তখন সংখাতত্ত্বে সব কিছুই ছিল বড় রকমের। আমি ক্ষয়ক্ষতির কথা বলছি। যখন সেখানে পৌছলাম এদের অনেকেই হয়তো মারা গেছে, নয়তো পরিবারে ফিরে গেছে। এটাই সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। আমাদের কিছু করা দরকার। আমরা ভেবে উপায় বের করার চেষ্টায় ছিলাম। ইংল্যান্ডের একজন ছিল আমার সঙ্গে। পরে আর তার হদিশ পাইনি। অদ্ভুত এক ব্যাপার।)

বীনা : আপনি কি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন?
ডেভিস : হ্যাঁ।

বীনা : কেন আপনি আগ্রহী হলেন?
ডেভিস : অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সি (গর্ভপাতের নিরাপদ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া) টার্মিনেটিংয়ে আমার বিশেষ একটি টেকনিক ছিল। আমি যুক্তরাজ্য থেকে মূলত ট্রেনিং নিয়েছি। যাহোক, আমি সাধারণত ৩০ সপ্তাহের নিচের গর্ভবতীদের গর্ভপাত করিয়েছি।
বীনা : ঢাকায় কোথায় কাজ করেছেন?
ডেভিস : ধানমন্ডীর একটি ক্লিনিকে। এছাড়া আরো অনেক শহরেই যেখানে হাসপাতাল বলে কিছু অবশিষ্ট ছিল। যেহেতু সংখ্যাটা অনেক বেশি, তাই মূলত আমি স্থানীয়দের শিখিয়ে দিচ্ছিলাম কীভাবে কী করতে হবে। তারা শিখে নিলে আমি অন্য কোথাও চলে যেতাম একই কাজ করতে।

বীনা : তথ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই জানতে চাচ্ছি, ঠিক কী ধরণের কাজ করতেন ওখানে নির্দিষ্ট করে বলবেন কী?
ডেভিস : আমি ওখানে যাওয়ার আগে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র নামে একটা সংস্থা হয়েছিল যার দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি সোবহান। তারা চেষ্টা করছিলেন গর্ভবতী সব মেয়েদের নিরাপদ কোনো এক জায়গায় জড়ো করতে। যাদের গর্ভপাত করানো সম্ভব, করাতে। আর বাচ্চা হলে তাদেরকে ইন্টারন্যাশনাল সোসাল সার্ভিসের হাতে তুলে দিতে।

বীনা : সেসময় আপনার সঙ্গে কাজ করেছেন এমন কারো নাম মনে আছে?
ডেভিস : যুদ্ধ পুনর্বাসন সংস্থার প্রধান ছিলেন জাস্টিস সোবহান আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে তৎপর মানুষটি ছিলেন ফন শুখ। তার নামের প্রথম অংশটা স্মরণ করতে পারছি না। তার স্ত্রীর নাম ছিল সম্ভবত মেরি। তারা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছিলেন। বাঙ্গালী কর্মকর্তাদের নাম আমার মনে নেই। তাছাড়া ইতিহাসের এই অংশটুকু কেউই মনে রাখতে চাইছিল না।

বীনা : এ কথা কেনো বললেন?
ডেভিস : ওহ, কারণ পুরো ব্যাপারটা গর্ভপাত এবং বাচ্চাদের দত্তকের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আরেকটা প্রেক্ষাপট হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান কমনওয়েলথভুক্ত দেশ ছিল, তাদের সব অফিসাররাই ইংল্যান্ডে ট্রেনিং নেওয়া। এটা এক অর্থে ব্রিটিশ সরকারের জন্যও ছিল বিব্রতকর। পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিল না এ নিয়ে এত হৈ চৈ করার কী আছে! আামি ওদের অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কুমিল্লার একটি কারাগারে আটক ছিল তারা এবং খুবই বাজে অবস্থায় (ব্যাপারটা আমার কাছে অবশ্য উপভোগ্য ঠেকেছে)। ওরা বলত, ‘এসব কী হচ্ছে? আমরা কী করতে পারতাম? যুদ্ধ হচ্ছিল তো!’

বীনা : মেয়েদের ধর্ষণ করাকে কীভাবে তারা ন্যায়সঙ্গত ভাবল?
ডেভিস : টিক্কা খান নাকি তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন একজন ভালো মুসলমান তার পিতা ছাড়া আর সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে! তাই তারা যতজন সম্ভব বাঙ্গালী মেয়েদের গর্ভবতী করার চেষ্টা করেছে। এটাই ছিল ওদের থিওরি।

বীনা : মেয়েদের কেন গর্ভবতী করতে হতো? তার কারণ বলেছে আপনাকে?
ডেভিস : হ্যাঁ, এর ফলে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে একটা নতুন প্রজন্ম জন্ম নেবে যাদের শরীরে থাকবে পশ্চিম পাকিস্তানী রক্ত। সেটাই তো ওরা বলল।

বীনা : পাকিস্তানের অনেক তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে ধর্ষনের সংখ্যা নাকি ইচ্ছা করেই বাড়িয়ে বলা হয়েছে। আপনি কী তা সত্যি মানেন?
ডেভিস : না না, প্রশ্নই ওঠে না। বরং তারা যা করেছে সেটাই রক্ষণশীলতার কারণে অনেকখানি চেপে যাওয়া হয়েছে। ওরা কীভাবে শহর দখল করত তার বর্ণনা খুবই চমকপ্রদ। পদাতিকদের পেছনে রেখে গোলন্দাজদের দিয়ে হাসপাতাল ও স্কুলে কামান দাগত। এতে গোটা শহরে একটা ভীতিকর আতঙ্ক তৈরি হতো। আর তারপরই পদাতিকরা ঢুকে মেয়েদের ওপর হামলা চালাত। একদম ছোট শিশু বাদ দিলে, একটু পরিণত মেয়েদের তারা শিকার বানাত। বাকিরা অংশ নিত শহর জ্বালানো পোড়ানোয়। পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং আওয়ামী লিগের সমর্থক সবাইকে গুলি করে মারা হতো। আর মেয়েদের সশস্ত্র পাহারায় রাখা হতো কোনো জায়গায় যাতে সৈন্যরা তাদের ব্যবহার করতে পারে। বিভৎস একটা ব্যাপার। এমন কোনো ঘটনা আগে ঘটেছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই। তারপরও ঠিক এমনটাই ঘটত।
বীনা : যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে ক্লিনিকের নারী-পুরষ বা সমাজকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন কখনো? নির্দিষ্ট করে বললে ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সঙ্গে?
ডেভিস : হ্যাঁ, প্রায় সবসময়ই শুনতাম। তাদের কিছু গল্প ছিল মর্মস্পর্শী। বিশালাকৃতির পাঠান সৈন্যরা একের পর এক ওদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। বিশ্বাসই হয় না কেউ অমন করতে পারে। স্বচ্ছল ঘরের এবং সুন্দরী মেয়েদের অফিসারদের জন্য রেখে দেওয়া হতো। বাকিদের বাটোয়ারা করে দেওয়া হতো অন্যদের মাঝে। আর মেয়েদের ওপর বর্বরতার কোনো সীমা ছিল না। ওদের ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না, অসুস্থ্য হলে ওষুধ ছিল না। অনেকেই ক্যাম্পেই মরে গেছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে অবিশ্বাসের একটা আবহ ছিল। কেউ স্বীকার করতে চাইত না ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছে! কিন্তু চাক্ষুস প্রমাণ বলে দিচ্ছিল কী ঘটেছিল, সত্যিই ঘটেছিল।

বীনা : বুঝতে পারছি আপনি কী বলতে চাইছেন। কারণ আমি গত চারবছর ধরে এদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু সংখ্যাটা বিশাল ছিল তাই তাদের অনেককেই পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক খেটে মাত্র কয়েকজনের দেখা পেয়েছি।
ডেভিস : সেটাই, কেউ স্বীকার করার কথা না। তারা স্রেফ চেপে গেছে, ভুলে গেছে। এমনটাই হয়।

বীনা : কিন্তু তখন কি ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল, মানে যুদ্ধের পরপর? কেউ কী তাদের দুঃস্মৃতির কথা বলেছিল?
ডেভিস : না, কেউই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খলতে চায়নি। প্রশ্ন করলে একটা উত্তরই মিলত। বেশিরভাগ সময়ই তা ছিল তাদের মনে নেই। আর পুরুষরাও এ ব্যাপারে একদমই কথা বলতে চাইত না! কারণ তাদের চোখে এসব মেয়ে ভ্রষ্টা হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশে এমনিতেও মেয়েদের অবস্থান সামাজিক পর্যায়ে অনেক নিচে। ভ্রষ্টা হয়ে যাওয়া মানে তাদের এমনিতেই আর কোনো মর্যাদা রইল না। তাদের মরে যাওয়াই ভালো। আর পুরুষরা তাদের মেরেও ফেলত। বিশ্বাস হচ্ছিল না। এটা পশ্চিমা সমাজের একদমই বিপরীত! একদমই উল্টো!

বীনা : আপনি নিশ্চয়ই বাংলা জানতেন না। যোগাযোগে সমস্যা হতো না?
ডেভিস : না, আমার একজন দোভাষী ছিল। তারা খুব দ্রুতই সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। আমাকে একটা ল্যান্ড রোভার, একজন ড্রাইভার ও ফিল্ড অফিসার দেওয়া হয়েছিল যিনি দোভাষীর কাজও করতেন। ড্রাইভারের নাম মমতাজ। ফিল্ড অফিসার একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, নাম মনে নেই। তাছাড়া ওদের বেশিরভাগই ভালো ইংরেজি বলতে পারত।

বীনা : আপনার মতে মেয়েগুলো কেনো নির্বাক থাকত?
ডেভিস : বুঝতেই পারছেন, আতঙ্কে। তারাই সবই দুঃস্বপ্নে ছিল। সেটা সামলে ওঠা তো কঠিন কাজ! বেশিরভাগই ছিল চরম উদ্বেগে। কারণ আমরা ছিলাম বিদেশী এবং ওরা কেউই বিদেশীদের বিশ্বাস করত না। আমরা ওদের কী করব সেটাই ওরা বুঝতে পারছিল না…

বীনা : রেপ ক্যাম্প ছিল এমন জায়গাগুলোতে গিয়েছেন কখনো?
ডেভিস : ধর্ষন শিবিরগুলো বিলুপ্ত হয়েছিল, পুনর্বাসন কর্মীরা মেয়েদের তাদের গ্রামে বা শহরে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যে কোনো মেয়েকে তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পর সে তাকে মেরে ফেলেছে। কারণ সে ভ্রষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানতেই চাইত না কী হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় নদীতে (ডেভিস শুধু যমুনার উল্লেখ করেছেন) প্রচুর লাশ পাওয়া যেত। এসব ঘটনাই ইউরোপের মানুষকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল।

বীনা : মেয়েগুলোর কথা মনে আছে? কতজনের গর্ভপাত করিয়েছেন?
ডেভিস : সঠিক পরিসংখ্যান মনে করা কঠিন। তবে দিনে শ’খানেক তো বটেই।

বীনা : ঢাকায় নাকি অন্যান্য শহরেও?
ডেভিস : আসলে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় আনাটা কঠিন ব্যাপার। ঢাকায় প্রতিদিন শ’খানেক আর ঢাকার বাইরে এর কম-বেশি হতো। আর অনেকেই কলকাতায় গিয়েছিল।

বীনা : আপনার কী আনুপাতিক হারটা মনে আছে? যেমন ধরুণ শ্রেণী ভেদে, ধর্মভেদে কতজন নারীকে দেখেছেন আপনি?
ডেভিস : শ্রেণীভেদ ঠিক আছে, কিন্তু কারো ধর্ম আমরা বিবেচনায় আনিনি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল তাদের বিপদমুক্ত
করা। সাধারণভাবে ধনী পরিবারের মেয়েরা যুদ্ধ থামার পরপরই কলকাতায় চলে গিয়েছিল গর্ভপাত করাতে।

বীনা : মেয়েদের কী জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তারা গর্ভপাত চায় কীনা? তাদের কী কোনো মতামত নেওয়া হয়েছিল?
ডেভিস : হ্যা অবশ্যই। আমাদের কাছে আসা সব মেয়েই গর্ভপাত ঘটাতে চেয়েছিল। আমাদের তো মনে পড়ে না এর ব্যতিক্রম কখনো ঘটেছে। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। যাদের বাচ্চা হয়েছে, তারা শিশুদের তুলে দিয়েছে পুনর্বাসন কর্মীদের হাতে। এভাবেই এসব শিশু আইএসএস এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় পেয়েছে। কতজন, সংখ্যাটা বলতে পারব না।

 

বীনা : ক্ষমা চাইছি এ ব্যাপারে আরেকটু খুটিনাটি জানতে। কিন্তু আমি খুবই আগ্রহী এটা জানতে যে মেয়েরা এই পুনর্বাসনের ব্যাপারটায় সত্যিই সম্মত ছিল কীনা। আপনার কী মনে পড়ে কোনো মেয়ে গর্ভপাত ঘটাতে না চেয়ে কান্নাকাটি করেছিল কীনা?
ডেভিস : না, কেউ কাঁদেনি। তারা এ ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিল। একদমই চোখের জল ফেলেনি। চুপচাপ সয়ে গেছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে তাতে!
বীনা : আপনি বলেছেন যেসব মায়েরা শুধু গর্ভপাত ঘটাতে চাইত, তাদেরকেই আপনি সাহায্য করেছেন। আমি সেই প্রসঙ্গে ফিরছি। মেয়েরা কাদের কাছে তাদের সম্মতি জানাত? সংশ্লিষ্ট ডাক্তার, নার্স বা সমাজকর্মীদের কাছে?
ডেভিস : হ্যা

বীনা : তাদের কী কোনো কাগজপত্র সাক্ষর দিত হতো?
ডেভিস : আমার ধারণা তাদের একটা সম্মতিপত্র সই দিত হতো। যদিও নিশ্চিত নই। সরকার পরাক্ষভাবে সেটা ব্যবস্থা করত। মূলত পুরাটার দায়িত্বে ছিল পুনর্বাসন সংস্থাই। এবং নারী সংস্থা। এটা নিশ্চিত, গর্ভপাত করাত চায় না এমন কেউ ক্লিনিকের ধারেকাছে ঘেষত না। তাই এটা কোনো ইস্যু নয়।

বীনা : আপনি কী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গর্ভপাতই করিয়ে গেছেন? সে সময় অনেকেই কি অ্যাডভান্সড স্টেটে ছিলো না?
ডেভিস : হ্যা, যে ছয় মাস ছিলাম আমি শুধু গর্ভপাতই করে গেছি। তাদের অপুষ্ঠি এমন ছিল যে ৪০ সপ্তাহর ভ্রূণও দেখতে অন্য কোথাকার ১৮ সপ্তাহর ভ্রূণের মতো ছিল।

বীনা : আপনার কী মনে পড়ে সেসব নারীদের কোনোরকম মানসিক সাহায্য করা হয়ছিল কীনা?
ডেভিস : কাউন্সেলিং? হ্যা, পুনর্বাসন সংস্থাগুলার দায়িত্ব ছিল তা। নারী সমাজকর্মীরা এ নিয়ে ওদের সঙ্গ কথা বলতন। তবে আমার মনে হয় না এতে কোনো কাজ হতো। কারণ সবাই ছিল অপুষ্ঠির শিকার, ভয়ানক ধরণের সব যৌন রোগ ছিল তাদর শরীরে। নারকীয় অবস্থা। দেশে তখন ওষুধ, সুবিধাদি বা সংশ্লিষ্ট রসদও অপ্রতুল। যা ছিল তাও বরাদ্দ ছিল আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। মেয়েদের জন্য তেমন কিছুই না। আমরা আমাদের নিজেদের ওষুধপত্র নিয়ে কাজ করছি।

বীনা : আপনি কোত্থেকে পেতেন? তা কি যথেষ্ট ছিল?
ডেভিস : ইংল্যান্ড থেকে। আমাকে বলা হয়ছিল নিজের জিনিস নিয়ে আসতে। এছাড়াও আমি দুই সেট যন্ত্রপাতি ও অ্যান্টি বায়োটিক নিয়ে এসেছিলাম।

বীনা : আপনি এই দুই সেট ইন্সট্রুমেন্ট গোটা ছয় মাস ব্যবহার করেছেন?
ডেভিস : হ্যা, বেশিরভাগ হাসপাতালের যন্ত্রপাতিই ধংস হয়ে গিয়েছিল, খুব বেশী কিছু ছিল না। আর ওষুধপত্র সব বরাদ্দ ছিল যুদ্ধাহত পুরুষদের জন্য।

বীনা : ব্যাপারটা কি নিরাপদ ছিল?
ডেভিস : হ্যা, যে সব রোগাক্রান্ত ছিল মেয়েগুলো তার তুলনায় নিরাপদ তো বটেই। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের জন্য।

বীনা : তাহল আপনি একই সঙ্গে গর্ভপাত এবং দত্তকদানের সঙ্গে জড়িত ছিলন?
ডেভিস : হ্যা। তব দত্তক কর্মসূচীর কথা উঠল সেটা শুধু মাত্র আইএসএসক দিয়ে দেওয়াতেই ছিল সীমাবদ্ধ। যে কোনো শিশু এমনকি নবজাতকও- এক হিসাবে কম নয়। কারণ সংখ্যাটা ছিল বিশাল। যুদ্ধের সময় যে জায়গায় এসব মেয়েদের রাখা হতো তা নিশ্চয়ই বেশ বড়ই ছিল, কিন্তু আমি যখন ওখান গেছি সেসব ছিল পরিত্যক্ত।

 

বীনা : ঢাকা শহরের বাইরে যেসব জায়গায় গিয়ছিলেন তার কথা বলুন, সেখানকার সুবিধাদি কেমন ছিল?
ডেভিস : হাসপাতাল আর পুনর্বাসন সংস্থা… নাম মনে নেই সেটার। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র বা সেরকম কিছু হব। বেশিরভাগ বড় শাখাগুলা ছিল তাদের অধীনে। আর আমি যাওয়ার আগে গর্ভপাতর সংখ্যা ছিল কম, কারণ কেউই সেটা করতে চাচ্ছিলো না। বেশিরভাগ চিকিৎসাকর্মীর মতই ব্যাপারটা ছিল অনৈতিক। যাহাক আমি স্বরাষ্ট্র সচিব রব চৌধুরীর একটা অথারাইজশন লেটার নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। এতে লেখা ছিল আমি যাই করব তা হচ্ছে আইনগতভাবে বৈধ এবং তারা যেন আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়। চিঠিটা খুঁজে পাইনি আর।। আছে হয়তো কোথাও… বাংলাদেশের অনেক কাগজ পত্র… আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম কারণ বেচে থাকতে এমন কিছুর অভিজ্ঞতা কখনো হবে বলে মনে হয়নি আর। তাই রেখে দিয়েছিলাম। সে সময়টাতে ব্যাপারটা ছিল কঠিন, নারকীয় এক অভিজ্ঞতা।

বীনা : সব মেয়েই কী গর্ভপাত বা সন্তান দিয়ে দিতে রাজি ছিল? একজনও কি বাচ্চা রেখে দিতে চায়নি?
ডেভিস : সত্যি বলতে, কয়েকজন চেয়েছে

বীনা : তাদের কী হয়ছিল জানেন?
ডেভিস : আমার কোনো ধারণা নেই। আইএসএস ওখানে ছিল যতগুলা সম্ভব শিশু দত্তক নিতে। কারণ আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরাপে দত্তক শিশুর আকাল পড়ছিল, আর সে ঘাটতিটা তারা পূরণ করতে চাইছিল।

বীনা : ইন্টরন্যাশনাল সোশাল সার্ভিস?
ডেভিস : হ্যা, এটা ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক। দত্তকর ব্যাপার সংশ্লিষ্ট বিশাল এক সংগঠন।

বীনা : সেই মায়েদের কী হয়েছিল?
ডেভিস : গর্ভপাত কিংবা ডেলিভারির পর তারা কিছুকাল ক্লিনিকে থাকত। তারপর পুনর্বাসন কেন্দ্রের হেফাজতে যেতো। সেখানে তারা যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারত। আর তারপর তাদের নানা ধরণের ট্রেনিং দেওয়া হতা। আমি কয়কজনকে দেখেছি। পুঁজি নিয়ে তারা কাপড় বানাচ্ছে। ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, নোয়াখালিতে।

(শেষ কথা : ইন্টারভিউ শেষে বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে বীনার সঙ্গে অনেক আলাপ করেছেন ডেভিস। তাদের আলোচনার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সম্ভাব্য বিচার নিয়ে। জিওফ বীনার হাত শক্ত করে ধরে নিজের বুকে রাখলেন। চোখে জল নিয়ে জানালেন তার সামর্থ্যের পুরাটা দিয়েই তিনি বাংলাদেশকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবেন।)

সংক্ষিপ্ত লিংক http://combostruct.com/5b3n